শ্রীরামপুর, ২৬ সেপ্টেম্বর: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরের মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসার পর ফের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে নিশানা করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শনিবার শ্রীরামপুরের কোর্ট ময়দানের সভা থেকে জ্ঞানেশকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করে তৃণমূলনেত্রী বলেন, ‘‘ভ্যানিশ কুমারকে যেমন ধরেছি, তেমন অন্যায়কারীদেরও ধরব। ভ্যানিশ কুমার মাস্ট গো। যতদিন না যাবে, আমাদের আন্দোলন চলবে।’’
এসআইআর শুরু হওয়ার পর থেকেই এই প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছেন মমতা। তাঁর অভিযোগ ছিল, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্যের বিভিন্ন আপত্তি নিয়ে প্রকাশিত রিপোর্টের পর সেই পুরনো অভিযোগই ফের সামনে এনেছেন তিনি। রিপোর্ট অনুযায়ী, ভোটার তালিকা, ভোটারদের তথ্য এবং কমিশনের সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। কমিশনের অবশ্য বক্তব্য, সদস্যদের মধ্যে মতের পার্থক্য স্বাভাবিক এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলি নিয়ম মেনেই নেওয়া হয়েছে।
শ্রীরামপুরের সভায় মমতা দাবি করেন, এসআইআরের মাধ্যমে বাংলায় প্রায় ৯৩ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ‘‘বাংলা দখল করবে বলে এসআইআর করেছিল। ৯৩ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দিয়েছে।’’ নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এসআইআরের পর প্রায় ৯০ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল; এর মধ্যে প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’-র কারণে শুনানির আওতায় আনা হয়েছিল। ফলে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য ও সরকারি পরিসংখ্যানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
মমতার বক্তব্যে উঠে আসে নির্বাচন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খান্নার নামও। তাঁর ভূমিকা নিয়েও আগেই প্রশ্ন তুলেছিল তৃণমূল। সাম্প্রতিক বিতর্কে কমিশনের সফটওয়্যারে রাজ্যস্তরের আধিকারিকদের প্রবেশাধিকার নিয়েও আপত্তির কথা প্রকাশ্যে এসেছে। নির্বাচন কমিশন অবশ্য জানিয়েছে, তাদের তথ্যপ্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলি কঠোর তথ্য-নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত হয়।
এ দিন মমতা আরও অভিযোগ করেন, ‘‘ফর্ম ৬ বস্তায় করে বিজেপির সিল লাগিয়ে জমা দিচ্ছিল বিজেপির লোকজন। সব তথ্য রেখে দিয়েছি।’’ তাঁর দাবি, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রথম থেকেই সরব ছিলেন। জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ভ্যানিশ কুমার’ বলে কটাক্ষ করার ব্যাখ্যায় মমতা বলেন, ‘‘ধরে ধরে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়ে দিচ্ছিল।’’
সভা থেকে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকেও আক্রমণ করেন তৃণমূলনেত্রী। তাঁর বক্তব্য, ‘‘ওরা বাংলা দখল করেছে, আমরা দিল্লি দখল করব।’’
এ দিন পুলিশের ভূমিকা নিয়েও সরব হন মমতা। তাঁর অভিযোগ, সভায় তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের আসা আটকাতে আগের রাতে শ্রীরামপুরের বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে তাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে। মমতার কথায়, ‘‘পুলিশ আমার শত্রু নয়। মানুষকে রক্ষা করা তাদের কাজ। কিন্তু আজ কী করছেন? আমার সভায় যাতে কেউ আসতে না পারেন, তার জন্য গতকাল রাতে শ্রীরামপুরের বাড়ি বাড়ি থেকে তৃণমূল সমর্থকদের খুঁজে বের করে অ্যারেস্ট করেছে।’’
উল্লেখ্য, কলকাতা হাই কোর্টের অনুমতি পাওয়ার পরই শনিবার শ্রীরামপুরের কোর্ট ময়দানে সভা করেন মমতা। আদালত নির্দিষ্ট শর্তে সভার অনুমতি দিয়েছিল এবং ২৬ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টা থেকে ৬টা পর্যন্ত সভা করার কথা জানানো হয়েছিল।
দলীয় বিভাজন ও প্রতীক সংক্রান্ত সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এটিই সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রথম বড় জনসভা বলে দলীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে। সেই মঞ্চ থেকেই এসআইআর, নির্বাচন কমিশন এবং জ্ঞানেশ কুমারকে নিশানা করে রাজনৈতিক আন্দোলন আরও তীব্র করার বার্তা দিলেন মমতা।