নয়াদিল্লি, ২৭ সেপ্টেম্বর: দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আরও বেশি জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার দাবিতে ২ অক্টোবর থেকে শুরু হতে চলা আন্দোলনের পাশে থাকার কথা জানালেন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। তবে মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিনে মুম্বই থেকে শুরু হতে চলা ওই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে তিনি নিজে শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকবেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তাঁর বক্তব্য, কোনও আন্দোলনের সাফল্যের জন্য সব সময় তাঁকে ব্যক্তিগত ভাবে সামনে থাকতে হবে এমন নয়। ইতিমধ্যেই বহু মানুষ এই ইস্যুতে সক্রিয় হওয়ায় তিনি আন্দোলনকারীদের পাশে থাকবেন, তবে তাঁর উপস্থিতির প্রয়োজন নাও হতে পারে।
২ অক্টোবর থেকে মুম্বইয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু করার ঘোষণা করেছে কক্রোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি। নির্বাচন কমিশনের কাজকর্মে জবাবদিহি বাড়ানো এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ওঠা প্রশ্নের প্রতিবাদেই এই কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে। সিজেপি জানিয়েছে, মুম্বই থেকে শুরু হয়ে পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন শহরে এই আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
আরও পড়ুন : Gyanesh Kumar: ‘বিজেপির এজেন্ট’, জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর দাবি কেরলের মুখ্যমন্ত্রীর
এই কর্মসূচি নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে ওয়াংচুক বলেন, দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও জবাবদিহিমূলক করার যে কোনও উদ্যোগকে তিনি সমর্থন করেন। তাঁর কথায়, “দেশে জবাবদিহি বাড়ানোর জন্য যে কোনও আন্দোলনের পাশে আমি সব সময় থাকব।” একই সঙ্গে তিনি বলেন, আন্দোলনগুলি নিজেদের শক্তিতেই এগিয়ে চলা উচিত। এই ইস্যুতে এখন অনেকেই সরব হওয়ায় তাঁর নিজের উপস্থিতি প্রয়োজন হবে না বলেই আশা করছেন তিনি।
ওয়াংচুকের বক্তব্যে উঠে এসেছে ভারতের গণতন্ত্রে নির্বাচন ব্যবস্থার গুরুত্বও। তাঁর মতে, একটি দেশের গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হল সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়াতেই যদি সমস্যা তৈরি হয়, তা হলে গণতন্ত্রের বাকি কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তিনি বলেন, সরকার যে প্রতিশ্রুতি দেয়, তা পূরণ করা উচিত। এই প্রসঙ্গে লাদাখকে ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতির কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
আরও পড়ুন : CJI Surya Kant: শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে পড়ুয়াদের অধিকার রক্ষা করবে আদালত, বললেন CJI সূর্য কান্ত
২ অক্টোবরের তারিখটির গুরুত্ব নিয়েও মন্তব্য করেন ওয়াংচুক। মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিনে আন্দোলন শুরু হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে গান্ধীর শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার দাবিতেও শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনের গুরুত্ব রয়েছে বলে তাঁর বক্তব্যের ইঙ্গিত।
ওয়াংচুকের এই অবস্থান সামনে এল এমন এক সময়ে, যখন নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। সম্প্রতি ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নির্বাচন কমিশনার এস এস সন্ধু এবং বিবেক যোশী গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার ভোটার নথিভুক্তি, নাম বাদ দেওয়া বা পুনর্বহাল এবং এসআইআর সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি বা প্রশ্ন তুলেছিলেন। সেই প্রতিবেদন প্রকাশের পরই কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক শুরু হয়।
তবে নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগের ব্যাখ্যা দিয়ে জানিয়েছে, দুই নির্বাচন কমিশনারের দেওয়া মতামত বা প্রশ্নগুলি মূলত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার আগের খসড়া পর্যায়ের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ। কমিশনের বক্তব্য, কোনও প্রতিষ্ঠানে আলোচনার সময় বিভিন্ন মত বা পরামর্শ উঠে আসা স্বাভাবিক এবং সেগুলিকে কমিশনের মধ্যে চূড়ান্ত মতবিরোধ হিসেবে দেখানো ঠিক নয়।
২৬ সেপ্টেম্বর তিন নির্বাচন কমিশনারকে নিয়ে পূর্ণ কমিশনের বৈঠকের পর নির্বাচন কমিশন আরও স্পষ্ট করে জানায় যে, এসআইআর সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মত ভাবেই নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৪ জুন এসআইআর সংক্রান্ত যে নির্দেশ জারি করা হয়েছিল, সেটিও তিন কমিশনারের সর্বসম্মত অনুমোদনেই হয়েছিল বলে কমিশন দাবি করেছে।
এসআইআর নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই ভোটারদের সুবিধার জন্য কিছু নতুন পদক্ষেপের কথাও জানিয়েছে কমিশন। কোনও ভোটারকে ‘আনম্যাপড’ বা নথিতে অসঙ্গতি রয়েছে বলে নোটিস দেওয়া হলে, সংশ্লিষ্ট বুথ লেভেল অফিসার বা বিএলও তাঁর বাড়িতে গিয়ে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করতে পারবেন। সাধারণ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভোটারকে শুনানির জন্য নির্বাচন দফতরে ব্যক্তিগত ভাবে হাজির হতে হবে না বলেও কমিশন জানিয়েছে।
এদিকে, এসআইআর এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিরোধী দলগুলির একাংশও সরব হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের দলগুলির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক এবং পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। অন্যদিকে, কক্রোচ জনতা পার্টি ইতিমধ্যেই ২ অক্টোবর থেকে দেশজুড়ে আন্দোলনের ঘোষণা করেছে।
এই পরিস্থিতিতে ওয়াংচুকের সমর্থন ২ অক্টোবরের কর্মসূচিকে আরও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। তবে আন্দোলনে তিনি নিজে উপস্থিত থাকবেন কি না, সে বিষয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত ঘোষণা নেই। তাঁর বক্তব্যে আপাতত স্পষ্ট, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতার দাবিতে তিনি আন্দোলনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে রয়েছেন, যদিও নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ব্যক্তিগত ভাবে প্রতিটি কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকাকে তিনি অপরিহার্য মনে করছেন না।