The NewsNest ডেস্ক: নন্দীগ্রামে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পায়ে চোট লাগার ঘটনা নিয়ে ফের শুরু হল রাজনৈতিক চাপানউতোর। শনিবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, ওই ঘটনায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পায়ে কোনও ফ্র্যাকচারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাঁর দাবি, বাঙুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সের ২০২১ সালের ১১ মার্চের একটি চিকিৎসা-নথিতে ‘ফ্র্যাকচারের কোনও প্রমাণ নেই’ বলে উল্লেখ রয়েছে। এই দাবির ভিত্তিতেই নির্বাচনী আচরণবিধি শেষ হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে তদন্তের কথা জানিয়েছেন তিনি।
২০২১ সালের ১০ মার্চ নন্দীগ্রামে নির্বাচনী প্রচারের সময় আহত হয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সময় তাঁর অভিযোগ ছিল, ভিড়ের মধ্যে কয়েক জন তাঁকে ধাক্কা দেওয়ায় গাড়ির দরজায় তাঁর পায়ে আঘাত লাগে। ঘটনাটি দ্রুত রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে। পরবর্তী সময়ে পায়ে প্লাস্টার এবং হুইলচেয়ারে বসেই নির্বাচনী প্রচারে দেখা গিয়েছিল মমতাকে। সেই পুরনো ঘটনাই এ বার নতুন করে সামনে এনেছেন শুভেন্দু। নবান্নে তিনি দাবি করেন, তাঁর হাতে থাকা চিকিৎসা-নথিতে বাঁ পায়ের পরীক্ষা সংক্রান্ত রিপোর্টে ফ্র্যাকচার বা হাড় সরে যাওয়ার কোনও প্রমাণ নেই। এই নথিকে সামনে রেখে তাঁর বক্তব্য, ২০২১ সালের ঘটনাটি নিয়ে যে দাবি করা হয়েছিল, তা নিয়ে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
তবে চিকিৎসা-নথির একটি নির্দিষ্ট রিপোর্টে ফ্র্যাকচার না থাকার উল্লেখ থাকলেই পুরো আঘাতের ঘটনা মিথ্যা প্রমাণিত হয় না—এমনটাই জানিয়েছে একাধিক সমসাময়িক প্রতিবেদনে উদ্ধৃত চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য। ২০২১ সালে এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসার সময় মমতার বাঁ পায়ের গোড়ালি ও পায়ের পাতায় চোটের কথা জানানো হয়েছিল। একই সঙ্গে শরীরের অন্য কয়েকটি অংশেও আঘাতের কথা সামনে এসেছিল। ফলে কোনও একটি সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট দিয়ে গোটা চিকিৎসা-প্রক্রিয়া সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
২০২১ সালের ঘটনার পর নির্বাচন কমিশনও বিষয়টি খতিয়ে দেখেছিল। কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষকদের রিপোর্টে পরিকল্পিত হামলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গাফিলতির বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপের কথাও জানিয়েছিল কমিশন। এ বার সেই পুরনো ঘটনার তদন্ত ফের শুরু করার কথা জানিয়েছেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, বর্তমানে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী আচরণবিধি কার্যকর রয়েছে। তাই এখনই বিস্তারিত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। ভোটপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর, অর্থাৎ ৯ অক্টোবরের পর বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের কথা জানানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
শুভেন্দুর অভিযোগের পাল্টা প্রতিক্রিয়াও এসেছে তৃণমূলের তরফে। তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ দাবি করেছেন, মমতার পায়ের চোট নিয়ে রাজনৈতিক প্রচার চালানো হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, মমতার পায়ে সত্যিই আঘাত লেগেছিল এবং চিকিৎসকেরা সেই আঘাতের বিষয়ে অবগত ছিলেন। সমাজমাধ্যমে মমতার আহত পায়ের ছবিও প্রকাশ করেছেন তিনি। কুণালের আরও দাবি, নরম টিস্যু, পেশি ও হাড়ের উপর গভীর আঘাত সারতে সময় লাগে এবং মমতার পায়ের ফোলা ভাব এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ফলে একটি চিকিৎসা-নথির নির্দিষ্ট অংশকে সামনে রেখে পুরো ঘটনাকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয় বলেই তাঁর বক্তব্য।
নন্দীগ্রামের সেই ঘটনাটি শুধু একটি চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিতর্ক ছিল না। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রাম থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে। প্রচারের মাঝখানে তাঁর চোট এবং পরবর্তী হুইলচেয়ারে প্রচার সেই নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ঘটনা হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন মমতা।
পাঁচ বছর পর উপনির্বাচনের আবহে সেই ঘটনাই ফের রাজনৈতিক আলোচনায়। এক দিকে শুভেন্দুর হাতে থাকা চিকিৎসা-নথির দাবি এবং নতুন তদন্তের ঘোষণা, অন্য দিকে তৃণমূলের পাল্টা বক্তব্য—দুই পক্ষের বক্তব্যে পুরনো বিতর্ক আবার সামনে এসেছে। তবে নতুন তদন্তের ফল বা সংশ্লিষ্ট সব চিকিৎসা-নথি প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত ২০২১ সালের আঘাতের প্রকৃতি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই। নন্দীগ্রামের উপনির্বাচন ঘিরে নির্বাচনী উত্তাপের মধ্যেই তাই মমতার পুরনো চোটের প্রসঙ্গ নতুন রাজনৈতিক মাত্রা পেল। এখন নজর ৯ অক্টোবরের পর রাজ্য সরকার এই বিষয়ে কী পদক্ষেপ করে এবং তদন্ত হলে তার ফল কী সামনে আসে, সেদিকেই।