কলকাতা, ২৭ সেপ্টেম্বর: এ বছর বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় না এলে তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মাকে ওড়িশায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন বলে দাবি করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নিজের রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রসঙ্গ তুলে এই মন্তব্য করেন তিনি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবলে।
শুভেন্দুর কথায়, ভোটের ফল বিজেপির বিপক্ষে গেলে তাঁর নিজের ক্ষেত্রে গ্রেফতারির আশঙ্কা থাকলেও তিনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু তাঁর বাবা-মা দু’জনেই প্রবীণ হওয়ায় তাঁদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁর বাবা শিশির কুমার অধিকারীর বয়স ৯০ বছর এবং মা ৮০ বছরের বেশি। শিশির অধিকারী দীর্ঘদিনের রাজনীতিক এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।
শুভেন্দু বলেন, “আমার বাবা ৯০ বছরের। মা ৮০-র বেশি। আমি লড়াই করার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। খারাপ ফল হলে জেলে যেতেও প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু ওই দু’জনকে ওড়িশায় পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছিলাম।”
এর আগে নিজের বক্তব্যের শুরুতে শুভেন্দু দাবি করেন, এবারের নির্বাচনে বাংলার মানুষ রাজ্যকে ‘বাঁচিয়েছে’। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচনের ফল অন্য রকম হলে পরিস্থিতি কী হত, তা কল্পনা করা কঠিন। তবে তাঁর এই বক্তব্য মূলত তাঁর নিজের রাজনৈতিক মূল্যায়ন এবং অতীতের পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য হিসেবেই সামনে এসেছে।
শনিবারের অনুষ্ঠানে বাংলার জনসংখ্যার পরিবর্তন এবং সংস্কৃতি নিয়েও মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যের সংস্কৃতি ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে আরও কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। একই অনুষ্ঠানে তিনি রাজ্যের সীমান্ত সুরক্ষা, বেআইনি অনুপ্রবেশ রুখতে পদক্ষেপ এবং ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে সরকারের অবস্থানের কথাও তুলে ধরেন।
শুভেন্দুর বক্তব্যের পর বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকারও তাঁর মন্তব্যের সমর্থনে প্রতিক্রিয়া দেন। তাঁর দাবি, বিষয়টি শুধু মুখ্যমন্ত্রী বা তাঁর পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; রাজ্যের বহু মানুষের ক্ষেত্রেও এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল বলে তিনি মনে করেন। তবে এই বক্তব্যটি বিজেপির পক্ষের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা।
বঙ্গের রাজনীতিতে অধিকারী পরিবারের দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে। শুভেন্দুর বাবা শিশির অধিকারী পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি এলাকার প্রবীণ রাজনীতিক। ফলে নিজের বাবা-মাকে ওড়িশায় সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন বলে শুভেন্দুর মন্তব্য রাজনৈতিক মহলেও আলাদা করে তাৎপর্য তৈরি করেছে।
শুভেন্দুর বক্তব্যে এবারের বিধানসভা নির্বাচনের ফলও উঠে আসে। তিনি দাবি করেন, রাজ্যের মানুষ বিজেপিকে ক্ষমতায় এনে বাংলার পরিস্থিতি বদলের সুযোগ দিয়েছেন। ন্যাশনাল লাইব্রেরির অনুষ্ঠানে তিনি রাজ্যের জনসংখ্যা, সংস্কৃতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়কে সরকারের অগ্রাধিকারের সঙ্গে যুক্ত করেন।
তিনি আরও বলেন, তাঁর সরকার ক্ষমতায় আসার পর অল্প সময়ের মধ্যেই একাধিক ক্ষেত্রে কাজ শুরু হয়েছে। সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার করা, বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং স্কুল ও নথিভুক্ত মাদ্রাসায় ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার মতো বিষয়গুলির কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
এর পাশাপাশি গরু সুরক্ষা নিয়েও বক্তব্য রাখেন শুভেন্দু। রাজ্যে গরুর আশ্রয়স্থল বা গোশালা তৈরিতে সরকার সহযোগিতা করবে বলে তিনি জানান। তাঁর বক্তব্য, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি রাজ্যের সীমান্ত নিরাপত্তার দিকেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
শুভেন্দুর এই মন্তব্যের সময় বাংলার রাজনীতিতে নির্বাচন কমিশন, ভোটার তালিকা এবং এসআইআর নিয়েও নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর চলছে। একদিকে তৃণমূল কংগ্রেস নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, অন্যদিকে বিজেপি এসআইআরকে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে। এই রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই শুভেন্দুর বাবা-মাকে ওড়িশায় পাঠানোর প্রস্তুতির কথা প্রকাশ্যে আসায় তাঁর মন্তব্য ঘিরে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
এর আগে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে বিজেপি বাংলায় অনুপ্রবেশ, নাগরিকত্ব এবং ভোটার তালিকার মতো বিষয়গুলিকে প্রচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু করেছিল। এসআইআর নিয়েও দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের বক্তব্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। বিজেপির বক্তব্য ছিল, প্রকৃত ভোটারদের অধিকার সুরক্ষিত রেখেই ভুয়ো নাম ও বেআইনি অনুপ্রবেশের অভিযোগ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তৃণমূল অবশ্য এসআইআর নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হওয়ার অভিযোগ তুলেছিল।
শনিবারের অনুষ্ঠানে শুভেন্দুর বক্তব্য সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়। তবে নিজের বাবা-মাকে ওড়িশায় পাঠানোর পরিকল্পনার কথা তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হিসেবে জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক লড়াইয়ের কারণে নিজের গ্রেফতারির সম্ভাবনা তিনি মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু বৃদ্ধ বাবা-মায়ের নিরাপত্তার কথা ভেবে তাঁদের অন্য রাজ্যে পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।
ন্যাশনাল লাইব্রেরির ওই অনুষ্ঠানে শুভেন্দুর পাশাপাশি আরএসএসের সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবলেও বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে মূলত বাংলার সংস্কৃতি, জনসংখ্যার পরিবর্তন এবং সনাতনী ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা হয়।