The NewsNest Desk : বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর বিষয়ে কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই বলে জানাল ভারত। তাঁর প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশের অনুরোধ বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। শনিবার ঢাকায় একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থার আয়োজিত আলোচনাসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরানোর বিষয়ে বারবার ঢাকার তরফে করা অনুরোধের প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে ত্রিবেদী বলেন, তাঁর প্রত্যর্পণের জন্য কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা বলা সম্ভব নয়। ভারতের পক্ষ থেকে আগেও জানানো হয়েছে যে বিষয়টি একটি নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়াই অনুসরণ করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে তীব্র সরকারবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারত চলে আসেন। তাঁর সরকারের পতনের পর থেকেই তাঁকে বাংলাদেশে ফেরানোর দাবি জানিয়ে আসছে ঢাকার বিভিন্ন সরকার। বর্তমানে ৭৯ বছর বয়সি হাসিনা ভারতে রয়েছেন।
শেখ হাসিনার ভারতে আসার প্রসঙ্গেও শনিবার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন ত্রিবেদী। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ভারতীয় বায়ুসেনা বা সেনাবাহিনীর বিমানে করে হাসিনাকে ভারতে নিয়ে আসা হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের বায়ুসেনার একটি বিমানে করেই তিনি ভারতে এসেছিলেন। সেই সময় ঢাকায় তাঁর সরকারি বাসভবনের দিকে আন্দোলনকারীরা এগিয়ে যাচ্ছিলেন।
ত্রিবেদীর বক্তব্য অনুযায়ী, হাসিনা তখনও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাওয়ায় প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতকে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। তিনি বলেন, সেই মুহূর্তে বাংলাদেশকে অবতরণের অনুমতি না দিলে পরিস্থিতি আরও কী দিকে গড়াত, তা বলা কঠিন ছিল।
ভারতীয় হাইকমিশনারের কথায়, বাংলাদেশের তৎকালীন পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত কঠিন এবং তা ‘দুঃখজনক পরিস্থিতি’র ফল। বিশ্বের কোথাও যেন এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেই আশাও প্রকাশ করেন তিনি।
শেখ হাসিনা ভারতে আসার পর বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়া সেই সরকার প্রায় ১৮ মাস বাংলাদেশ পরিচালনা করে। ওই সময় ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেও টানাপড়েন তৈরি হয়।
এর মধ্যেই বাংলাদেশে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অনুপস্থিতিতে বিচার হয় এবং তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁর রাজনৈতিক দল আওয়ামি লিগের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়। পরে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার কূটনৈতিক নোটের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানায়।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তারিক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসে। নতুন সরকারও শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি অব্যাহত রেখেছে। ফলে বিষয়টি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে উঠেছে।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্নটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমানের ভারত সফরের ক্ষেত্রেও আলোচনায় এসেছে। গত মাসে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য ভারত বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তবে সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেননি তারিক রহমান। এর পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক সফরের একটি পৃথক আমন্ত্রণও বাংলাদেশের কাছে ছিল।
সম্প্রতি নয়াদিল্লি থেকে শেখ হাসিনার একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন নিয়েও দুই দেশের মধ্যে টানাপড়েন তৈরি হয়। বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছিল, ওই ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানের কারণে তারিক রহমানের প্রস্তাবিত ভারত সফরের পরিবেশ প্রভাবিত হয়েছে। ভারত অবশ্য জানিয়েছে, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে তাদের কোনও ভূমিকা ছিল না এবং সেখানে বাংলাদেশ সরকার সম্পর্কে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে ভারত একমত নয়।
তবে টানাপড়েনের মধ্যেও দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বাংলাদেশের বিদেশ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সম্প্রতি দিনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকের পর জানিয়েছিলেন, তারিক রহমানের ভারত সফর নিয়ে আলোচনা এগোনোর বিষয়ে ঢাকা আশাবাদী। যদিও এখনও সফরের কোনও নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ভারতের অবস্থান আপাতত স্পষ্ট—বাংলাদেশের অনুরোধ আইনি প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা হচ্ছে, কিন্তু তাঁকে কবে বাংলাদেশে ফেরানো হবে, সে বিষয়ে কোনও সময়সীমা জানানো হয়নি।