কলকাতা, ২৪ সেপ্টেম্বর: ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) ঘিরে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যেই নতুন অভিযোগ তুললেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। বৃহস্পতিবার সমাজমাধ্যমে এপ্রিল মাসের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের কয়েকটি স্ক্রিনশট প্রকাশ করে তাঁর দাবি, প্রায় ৩০ লক্ষ ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কোনও পরিকল্পনা নিয়ে ওই গ্রুপে আলোচনা হয়েছিল। যদিও ওই স্ক্রিনশটের সত্যতা, সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট এবং সেখানে করা দাবির স্বাধীন ভাবে কোনও যাচাই এখনও হয়নি।
অভিষেক এক্স-এ লিখেছেন, এপ্রিলের একটি পর্যবেক্ষকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের স্ক্রিনশট তাঁর হাতে এসেছে। তাঁর দাবি, সেখানে ৩০ লক্ষ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ‘ষড়যন্ত্র’ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া বা নীরব থাকা যায় না বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
এই প্রসঙ্গে সরাসরি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং দেশের প্রধান বিচারপতির নাম উল্লেখ করে তাঁদের কাছে জবাবদিহির দাবি তুলেছেন অভিষেক। তবে তৃণমূল নেতার প্রকাশ করা স্ক্রিনশটে যে নির্দিষ্ট দাবি রয়েছে, সেটি এখনও স্বাধীন ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এসআইআর নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই নতুন অভিযোগ
ভোটার তালিকার এসআইআর ঘিরে ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশন এবং বিরোধী দলগুলির মধ্যে টানাপড়েন চলছে। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এর সময় ২৭.১৬ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছিল বলে সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে ২২ লক্ষেরও বেশি ভোটার নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্তির আবেদন করেছেন।
তবে এই পরিসংখ্যানের ব্যাখ্যা নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। কমিশনের বক্তব্য, এসআইআর-এর সময় মৃত, স্থানান্তরিত, অনুপস্থিত বা একাধিক বার নথিভুক্ত ভোটারের মতো বিভিন্ন কারণে নাম নিয়ে যাচাই করা হয়েছিল। অন্য দিকে, বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু এবং বিবেক যোশী গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। ভোটার তালিকায় নাম সংযোজন-বিয়োজন, ফর্ম ৬ এবং ভোটার ডেটাবেস পরিচালনা-সহ একাধিক বিষয় নিয়ে তাঁদের আপত্তির কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিশনের বক্তব্য কী?
অন্য দিকে, নির্বাচন কমিশনের তরফে অভ্যন্তরীণ বিভাজনের ধারণা খারিজ করা হয়েছে। কমিশন সূত্রের বক্তব্য, এসআইআর-সহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মত ভাবেই নেওয়া হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ আলোচনায় মতামত বা পর্যবেক্ষণ থাকা স্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অংশ।
ফলে এক দিকে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অন্য দিকে ৩০ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে।
জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে আক্রমণ বাড়ছে
জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর দাবিও গত কয়েক দিনে আরও জোরালো হয়েছে। বৃহস্পতিবারই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি রাজনৈতিক সংগঠন ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা দিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করেছে। সময়সীমার মধ্যে পদত্যাগ না হলে দিল্লির জন্তর মন্তরে ফের আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
এর আগে বুধবার পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে গ্রেফতার এবং ফৌজদারি মামলা শুরুর দাবি তুলেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, ভোটারদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। পুরনো ভোটার তালিকা পুনর্বহাল এবং যেসব জায়গায় ভোটাররা ভোট দিতে পারেননি বলে তাঁর অভিযোগ, সেখানে নতুন করে ভোটগ্রহণের দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
এই আবহেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রকাশ করা হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্রিনশট নতুন করে নির্বাচন কমিশন এবং এসআইআর বিতর্ককে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। তবে স্ক্রিনশটে থাকা তথ্যের সত্যতা এবং তার সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট সরকারি ভাবে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ৩০ লক্ষ নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।