The NewsNest Desk: মালদহ জেলা পরিষদের পর এ বার ইংরেজবাজার পুরসভাতেও পালাবদল। বুধবার চেয়ারম্যান নির্বাচনের ভোটাভুটিতে বিজেপির অম্লান ভাদুড়িকে সমর্থন করলেন তৃণমূল থেকে ‘নির্দল’ হওয়া ১১ কাউন্সিলর। তাঁদের পাশাপাশি এক জন নির্দল কাউন্সিলরও বিজেপি প্রার্থীকে সমর্থন করেন। ফলে পুরসভায় মাত্র তিন জন কাউন্সিলর নিয়ে থাকা বিজেপিই শেষ পর্যন্ত চেয়ারম্যানের পদ দখল করল।
ইংরেজবাজার পুরসভার চেয়ারম্যান পদে ছিলেন কৃষ্ণেন্দুনারায়ণ চৌধুরী। গত মাসে তিনি পদত্যাগ করার পর থেকেই নতুন চেয়ারম্যান কে হবেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়। বুধবার নতুন বোর্ড গঠনের জন্য বিশেষ সভা ডাকা হয়েছিল। সেই সভাতেই নাটকীয় ভাবে বদলে গেল পুরসভার রাজনৈতিক সমীকরণ।
বোর্ড গঠনের আগে তৃণমূলের ১১ জন কাউন্সিলর নিজেদের ‘নির্দল’ হিসেবে ঘোষণা করেন। এ বিষয়ে জেলাশাসকের কাছেও তাঁরা চিঠি দেন। তাঁদের বক্তব্য, তাঁরা তৃণমূল ছেড়ে অন্য কোনও দলে যোগ দেননি। বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্দল হিসেবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ওই শিবিরের কাউন্সিলর শুভময় বসুর দাবি, তৃণমূলের প্রতীক ‘ফ্রিজ’ হয়ে যাওয়ার পর তাঁদের রাজনৈতিক পরিচিতি নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। পাশাপাশি পুর পরিষেবাও ব্যাহত হচ্ছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচিত হওয়ার পর মানুষের জন্য কাজ করার বদলে গত কয়েক মাস ধরে কার্যত ওয়ার্ড অফিসে বসে শংসাপত্র দেওয়ার মধ্যেই তাঁদের কাজ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। তাই বাকি মেয়াদে নির্দল হিসেবে থেকে নাগরিক পরিষেবায় জোর দিতে চান তাঁরা।
তবে এই ১১ কাউন্সিলর নিজেরা চেয়ারম্যান পদে কোনও প্রার্থী দেবেন না বলেই আগে জানিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে ভোটাভুটির আগে থেকেই বিজেপির অম্লান ভাদুড়ির পক্ষে সমীকরণ তৈরি হতে শুরু করে।
সভায় বিজেপি কাউন্সিলর সুতপা মুখোপাধ্যায় চেয়ারম্যান পদে অম্লান ভাদুড়ির নাম প্রস্তাব করেন। সেই প্রস্তাব সমর্থন করেন কৃষ্ণা নাগ। এরপর তৃণমূল থেকে নির্দল হওয়া ১১ কাউন্সিলর অম্লানকে সমর্থন জানান। পুরসভায় থাকা আরও এক নির্দল কাউন্সিলরও বিজেপি প্রার্থীর পাশে দাঁড়ান। শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন অম্লান ভাদুড়ি।
ইংরেজবাজার পুরসভায় এত দিন তৃণমূলেরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। মোট ২৫ জন কাউন্সিলর ছিল তৃণমূলের। ১১ জন নির্দল হয়ে যাওয়ার পরও বাকি ১৪ জন তৃণমূল কাউন্সিলর বুধবারের সভায় উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু ভোটাভুটিতে এক ভোটের ব্যবধানে বিজেপির প্রার্থী জয়ী হন। অর্থাৎ সংখ্যার বিচারে মাত্র তিন জন কাউন্সিলর থাকা বিজেপি সমর্থনের অঙ্কে পুরবোর্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিল।
অবশ্য এই ঘটনাকে তৃণমূল ভাঙানোর ফল হিসেবে দেখতে নারাজ নতুন চেয়ারম্যান অম্লান ভাদুড়ি। তাঁর দাবি, কাউকে দল থেকে ভাঙিয়ে বিজেপিতে আনা হয়নি। চেয়ারম্যান পদত্যাগ করার পর নিয়ম মেনেই নতুন করে বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া হয়েছে এবং সেই ভোটেই তাঁকে সমর্থন করেছেন ওই কাউন্সিলররা।
বুধবারের সভায় তৃণমূল কাউন্সিলর হিসেবেই উপস্থিত ছিলেন সদ্য প্রাক্তন চেয়ারম্যান কৃষ্ণেন্দুনারায়ণ চৌধুরী। ছিলেন প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক তথা প্রাক্তন চেয়ারম্যান নীহাররঞ্জন ঘোষের স্ত্রী গায়ত্রী ঘোষও। অতীতে কৃষ্ণেন্দু ও নীহাররঞ্জনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এলেও এ দিনের ভোটাভুটিতে দু’জনের শিবিরকে একই পরিসরে দেখা যায়। ১১ জন কাউন্সিলরের নির্দল হওয়ার প্রসঙ্গে কৃষ্ণেন্দু বলেন, কেন তাঁরা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা তাঁর জানা নেই। বিষয়টি তাঁদের নিজেদের সিদ্ধান্ত বলেই মন্তব্য করেন তিনি।
মালদহে এই নিয়ে টানা দু’দিনে স্থানীয় প্রশাসনের দুই গুরুত্বপূর্ণ স্তরে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাল। মঙ্গলবার তৃণমূলের একাংশের সমর্থন নিয়ে মালদহ জেলা পরিষদের দখল নিয়েছিল বিজেপি। সেখানে বিজেপির সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র চার। ভোটাভুটিতে তৃণমূলের একাংশের সমর্থন পাওয়ার পর বিজেপি জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
তার পরের দিনই ইংরেজবাজার পুরসভাতেও একই ধরনের সমীকরণ দেখা গেল। ফলে মালদহে বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক চর্চা শুরু হয়েছে। অন্য দিকে, তৃণমূলের অন্দরে ভাঙন, কাউন্সিলরদের ‘নির্দল’ পরিচয় গ্রহণ এবং স্থানীয় প্রশাসনে তার প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। আগামী দিনে এই দুই বোর্ডে রাজনৈতিক সমীকরণ কতটা স্থায়ী হয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।