The NewsNest Desk : দিল্লিতে বসে ফের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি তুললেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটার তালিকা সংশোধন এবং ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে আনলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার রাজধানীতে পৃথক সাংবাদিক বৈঠকে মমতা ও অভিষেকের বক্তব্যে মূলত নির্বাচন কমিশন, এসআইআর এবং ভোটার তালিকা নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক সংঘাতের ছবি সামনে আসে।
মমতার বক্তব্যে উঠে এসেছে আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত। তিনি বলেন, ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। তার আগেই ‘সুখবর’ আসতে পারে। তবে সেই ‘সুখবর’ বলতে তিনি ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা স্পষ্ট করেননি। তাঁর বক্তব্য, ‘‘খেলা শুরু হয়ে গিয়েছে। তার আগেই কী কী হয়, দেখতে থাকুন। শিগগিরই সুখবর আসবে।’’ একই সঙ্গে জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরে যাওয়ার দাবি জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, নিজে থেকে সরে গেলে জ্ঞানেশের সম্মান থাকবে।
এই দাবির পটভূমিতে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের কার্যপ্রণালী এবং বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR নিয়ে চলা বিতর্ক। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংক্রান্ত সফটওয়্যার ও অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসার পর বিরোধী দলগুলি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি আরও জোরালো করেছে। কমিশন অবশ্য ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়াকে আইনসঙ্গত বলে জানিয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যকে নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। ভোটার-তালিকা সংক্রান্ত সফটওয়্যার খতিয়ে দেখতে কমিশন পর্যালোচনার ব্যবস্থাও করেছে।
বুধবার দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে INDIA জোটের বৈঠকেও SIR এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের বিষয়টি আলোচনায় আসে। বিরোধী জোটের নেতারা যৌথ আন্দোলনের পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা করেছেন। ১ অক্টোবর প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিকে সামনে রেখে দেশজুড়ে কর্মসূচির পরিকল্পনাও করছে বিরোধী জোট।
বৃহস্পতিবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের অন্তত ১৫০টি বিধানসভা কেন্দ্রের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, ওই কেন্দ্রগুলিতে SIR-এর সময় বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা সংশ্লিষ্ট আসনে বিজেপি প্রার্থীর জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি। কোন কেন্দ্রে কত নাম বাদ পড়েছে এবং কত ভোটে বিজেপি প্রার্থী জিতেছেন, সেই তুলনাও তিনি তুলে ধরেছেন। তবে এই ধরনের পরিসংখ্যান কোনও নির্দিষ্ট আসনে ভোটের ফল SIR-এর কারণে বদলে গিয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত একাই প্রমাণ করে না। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে।
অভিষেকের আরও অভিযোগ, জ্ঞানেশ কুমারের তত্ত্বাবধানে Form 6-এর মাধ্যমে নতুন ভোটারের নাম তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে এবং তাঁদের একাংশকে অন্য জায়গা থেকে পশ্চিমবঙ্গে আনা হয়েছিল। তিনি ভোটকেন্দ্রের CCTV ফুটেজ প্রকাশের দাবিও ফের তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, অন্তত ১০০টি কেন্দ্রের নাম তিনি দিতে পারেন এবং দুপুর ১২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বুথের ফুটেজ প্রকাশ করা হোক। তৃণমূলের অভিযোগ, ওই সময়ের মধ্যে বুথে দলের এজেন্টদের উপর হামলা এবং ভোটে অনিয়ম হয়েছে।
ভবানীপুরের প্রসঙ্গ টেনে মমতাও ভোটে কারচুপির অভিযোগ করেন। তিনি দাবি করেন, ওই কেন্দ্রে তাঁর জয়ের ব্যবধান বদলে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। EVM নিয়েও অভিযোগ করেন তিনি। জ্ঞানেশ কুমারকে ফের ‘ভ্যানিশ কুমার’ বলে কটাক্ষ করেন তৃণমূল নেত্রী। তবে এসব অভিযোগের কোনওটিকেই স্বাধীনভাবে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের আইনি সুরক্ষা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মমতা। ২০২৩ সালের Chief Election Commissioner and Other Election Commissioners (Appointment, Conditions of Service and Term of Office) Act-এর ১৬ নম্বর ধারায় কমিশনারদের সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সুরক্ষার বিধান রয়েছে। মমতার অভিযোগ, এই আইনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক জবাবদিহি দুর্বল করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি রাজ্য পুলিশ এবং তাঁর দলের নেতা-কর্মীদের ভয় দেখানোর অভিযোগও করেন মমতা। তাঁর দাবি, বিরোধী শিবিরে যোগ না দিলে জেলে পাঠানোর হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এই অভিযোগেরও রাজনৈতিক বিরোধীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য রয়েছে।
অন্য দিকে, নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বিরোধীদের অভিযোগকে বিজেপিও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে। ফলে SIR, ভোটার তালিকা, Form 6 এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক এখন জাতীয় স্তরেও আরও তীব্র হচ্ছে।