The NewsNest Desk: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়ানোর আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে বাড়ল অপরিশোধিত তেলের দাম। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর সৌদি আরবে হামলা, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ঘিরে উত্তেজনা এবং একাধিক অঞ্চলে তেল সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কা—সব মিলিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল পিছু ১১২ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা গত মে মাসের পর সর্বোচ্চ।
বাজারের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৮টা ১৮ মিনিট নাগাদ ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্সের দাম ব্যারেল পিছু ৩.৩৫ ডলার বা ৩.০৮ শতাংশ বেড়ে ১১২.১৭ ডলারে পৌঁছয়। লেনদেনের এক পর্যায়ে দাম উঠেছিল ১১২.৫৫ ডলারেও। অন্য দিকে, আমেরিকার ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ২.৬৮ ডলার বা ২.৭৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল পিছু ৯৯.৮৩ ডলারে পৌঁছয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। সেই আশঙ্কাই এখন দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
সৌদি আরবে হুথি হামলায় বাড়ছে উদ্বেগ
বুধবার সৌদি আরবের একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী বলে জানিয়েছে রয়টার্স। দাম্মামের একটি অসামরিক বিমানবন্দরে হামলায় অন্তত এক জনের মৃত্যু এবং আট জনের আহত হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছে। পাশাপাশি, সৌদি আরবের একটি তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় দু’জনের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল রফতানিকারক দেশ। ফলে সে দেশের তেল উৎপাদন কেন্দ্র, শোধনাগার ও রফতানি পরিকাঠামোয় হামলার আশঙ্কা আন্তর্জাতিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। উৎপাদন বা সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন ঘটলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তেল বাজারের বিশ্লেষক তামাস ভার্গার মতে, ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাজারকে আশ্বস্ত করার জন্য যথেষ্ট নয়। তবে উদ্বেগের মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেলের রফতানি তুলনামূলক ভাবে বেশি রয়েছে। মর্গ্যান স্ট্যানলির বিশ্লেষকদের অনুমান, গত সপ্তাহে ওই অঞ্চল থেকে দৈনিক প্রায় ১ কোটি ৭০ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রফতানি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী ঘিরে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি
বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী। এই পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পরিবহণ করা হয়। সেখানে জাহাজে হামলা, মাইন বিস্ফোরণ বা সামরিক উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা চাপে পড়তে পারে।বৃহস্পতিবার ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পসের নৌবাহিনী দাবি করেছে, উত্তর উপসাগরীয় এলাকায় অবৈধ তেল স্থানান্তরের সঙ্গে যুক্ত চারটি জাহাজের গতিবিধি শনাক্ত করার পর সেগুলিকে নিশানা করা হয়েছে। বুধবার ওই জাহাজগুলিতে একযোগে আঘাত হানা হয় এবং সেগুলিতে আগুন ধরে যায় বলে দাবি করেছে ইরানি বাহিনী। হরমুজ প্রণালীর পশ্চিমে আরও তিনটি জাহাজ মাইনের সংস্পর্শে এসেছে বলেও জানানো হয়েছে। এই ঘটনাগুলির স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ যাচাই এখনও প্রয়োজন। এ দিকে, মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় সৌদি আরবে কর্মরত কিছু মার্কিন কূটনীতিক এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আমেরিকার বিদেশ দফতর বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
লিবিয়াতেও তেল উৎপাদনে বিঘ্ন
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে লিবিয়াতেও তেল সরবরাহ নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে। হামাদা ও তাহারা তেলক্ষেত্র থেকে জাওইয়া বন্দরের দিকে যাওয়া একটি তেলের পাইপলাইনের ভাল্ভ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট দুই তেলক্ষেত্রে উৎপাদন কমেছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন লিবিয়ার জাতীয় তেল সংস্থার প্রধান। অন্য দিকে, আমেরিকায় জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ট্রাম্প প্রশাসন দেশের জরুরি হিটিং অয়েল মজুতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঋণ হিসেবে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। ডিজেলের ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতের জেরে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির চাপ সামলাতেই এই পদক্ষেপ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউক্রেন শান্তি আলোচনা কি স্বস্তি দেবে বাজারকে?
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎও নজরে রয়েছে তেল ব্যবসায়ীদের। বুধবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সেন্ট পিটার্সবার্গে বৈঠক করেন মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টা এবং নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরু করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। ক্রেমলিনের দাবি, আগামী মাসের মধ্যেই আমেরিকার মধ্যস্থতায় ইউক্রেনের সঙ্গে শান্তি আলোচনা ফের শুরু করতে রাজি হয়েছে মস্কো। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও দ্রুত আলোচনা শুরুর আশা প্রকাশ করেছেন। তবে আপাতত তেলের বাজারে স্বস্তির চেয়ে অনিশ্চয়তাই বেশি। সৌদি আরবে নতুন হামলা, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এবং লিবিয়ায় উৎপাদন হ্রাস—সব মিলিয়ে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সংঘাত আরও তীব্র হলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা বাজার বিশেষজ্ঞদের।