লখনউ, ২৭ সেপ্টেম্বর: টানা ভারি বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত উত্তরপ্রদেশ। গত কয়েক দিনে প্রবল বৃষ্টি ও ঝড়ের জেরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৫৬ জনের। আহত হয়েছেন আরও ৪৬ জন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১,০২১টি বাড়ি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বৃষ্টিজনিত ঘটনায় ১০৭টি পশুরও মৃত্যু হয়েছে। একাধিক জেলায় জলমগ্ন রাস্তা, প্লাবিত নিচু এলাকা এবং ফসলের ক্ষতির জেরে স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হয়েছে।
উত্তরপ্রদেশের ত্রাণ কমিশনারের দফতরের পরিস্থিতি রিপোর্ট অনুযায়ী, মৃত্যুর সংখ্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলা সীতাপুর। সেখানে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। লখিমপুর খেরি, বাহরাইচ ও বালরামপুরে পাঁচজন করে এবং অযোধ্যা ও গোরখপুরে চারজন করে প্রাণ হারিয়েছেন। আহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাতজন হারদইয়ের বাসিন্দা। মৈনপুরী, শ্রাবস্তী ও বারাবাঁকিতে পাঁচজন করে এবং সীতাপুর ও লখিমপুর খেরিতে তিনজন করে আহত হয়েছেন।
বৃষ্টির জেরে পশুপালন ক্ষেত্রেও ক্ষতি হয়েছে। রাজ্যজুড়ে ১০৭টি পশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। এর মধ্যে হারদইয়ে ২৮টি পশু মারা গিয়েছে। সীতাপুরে ১৬টি এবং কন্নৌজে ১৪টি পশুর মৃত্যু হয়েছে। বাহরাইচ ও কানপুর দেহাতে সাতটি করে এবং উন্নাওয়ে ছয়টি পশু মারা গিয়েছে।
বাড়িঘরের ক্ষয়ক্ষতির ছবিও উদ্বেগজনক। হারদইয়ে সবচেয়ে বেশি ২৭২টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সীতাপুরে ১০৮টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া চান্দৌলি, অরাইয়া, গোন্ডা, হামিরপুর, শাহজাহানপুর এবং বাহরাইচেও বহু বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফসলের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ হিসাব এখনও তৈরি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
আরও পড়ুন : MrBeast রণবীরের সাহায্যে ‘জয় শ্রী রাম’ বললেন মিস্টারবিস্ট, ‘রামায়ণা’ অনুষ্ঠানে চমক
ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বান্দায় ২২৭.৬ মিলিমিটার, ফতেহগড়ে ২২৪ মিলিমিটার, বাহরাইচের নানপাড়ায় ২১৭ মিলিমিটার, হারদইয়ে ২১৪ মিলিমিটার এবং হামিরপুরে ২১০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। কন্নৌজেও ২০৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। লখনউতে ২১ ঘণ্টায় ১২৫.৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
অতিরিক্ত বৃষ্টির মাত্রাও ছিল অত্যন্ত বেশি। ত্রাণ কমিশনারের দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ৪৮ ঘণ্টায় উত্তরপ্রদেশে গড়ে ৬৬.৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যেখানে স্বাভাবিক পরিমাণ ৭.৬ মিলিমিটার। অর্থাৎ স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৭৭৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। রাজ্যের ৭৫টি জেলার মধ্যে ৫৬টি জেলায় ‘লার্জ এক্সেস’ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
ফলে লখনউ-সহ একাধিক শহর ও জেলায় জল জমে যায়। রাস্তাঘাটে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নিচু এলাকার বাসিন্দাদের সমস্যায় পড়তে হয়েছে। প্রবল হাওয়া ও বৃষ্টিতে গাছ এবং বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। অযোধ্যার রামপথ, রামমন্দির সংলগ্ন এলাকা, হনুমানগড়ি এবং সরযূ-সংলগ্ন এলাকাতেও যাতায়াতে সমস্যা তৈরি হয়।
আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, উত্তরপ্রদেশের বেশ কিছু এলাকায় ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে মধ্যাঞ্চল ও তরাই অঞ্চলের কিছু এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে অতিভারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। কয়েকটি জলাধার এলাকায় আকস্মিক বন্যার হালকা থেকে মাঝারি ঝুঁকির কথাও জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর।
এই পরিস্থিতিতে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা জোরদার করেছে প্রশাসন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে সাহায্য, বাড়িঘরের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব তৈরি এবং ফসলের ক্ষতির মূল্যায়ন চলছে। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথও ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত ত্রাণ ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
আরও পড়ুন : Govinda: ভাঙা সংসার নতুন করে ভাঙতে হয় না’, নাম না করে সুনীতাকে নিশানা কোমলের
প্রবল বৃষ্টির মধ্যে উনাওয়ের কাছে গঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের একটি অংশে জল জমে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব জলমগ্ন এক্সপ্রেসওয়ের একটি ভিডিয়ো সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে রাসটির নাম ব্যঙ্গ করে ‘গঙ্গা এক্সপ্রেস ওয়াটারওয়ে’ করার কথা বলেন। তিনি এক্সপ্রেসওয়ের পরিস্থিতি নিয়ে রাজ্য সরকারের সমালোচনাও করেন।
অন্যদিকে বহুজন সমাজ পার্টির প্রধান মায়াবতী ভারি বৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রশাসনের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছনো, জল নিষ্কাশন এবং আরও বৃষ্টির সম্ভাবনার মধ্যে নিচু এলাকার মানুষকে নিরাপদ রাখা।