The NewsNest Desk: দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সরব হলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর দিল্লিতে এটিই ছিল তাঁর প্রথম বড় সাংবাদিক বৈঠক। তবে নির্বাচনী ফল ঘুরিয়ে দিতে দলের পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার চেয়ে তাঁর বক্তব্যের বড় অংশ জুড়ে থাকল নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ভোট-পরবর্তী হিংসা এবং জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা।
তবে সাংবাদিক বৈঠকের শুরুতেই অন্য এক ঘটনায় বিরক্তি প্রকাশ করেন মমতা। তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েনের সাউথ অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে বৈঠক চলাকালীন বাইরে লনমোয়ার চালানোর শব্দে বারবার বিঘ্নিত হচ্ছিল অনুষ্ঠান। মমতা ইঙ্গিত দেন, এই শব্দ ইচ্ছাকৃত ভাবে করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। পরে ডেরেক বাইরে গিয়ে পুরকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে কিছু সময়ের জন্য লন কাটার কাজ বন্ধ করান।
এর পরেই সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে নির্বাচন কমিশনকে নিশানা করেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের আগে, ভোটের সময় এবং ভোটের পরেও তাঁর দলের কর্মী-সমর্থকদের ওপর হিংসার ঘটনা ঘটেছে। তিনি দাবি করেন, ভোট-পরবর্তী হিংসায় বহু মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এবং অনেকে ঘরছাড়া হয়েছেন। মমতার দাবি, ইতিমধ্যেই ৭০ জনের বেশি মানুষ খুন এবং ৪৫ জনের বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তবে এই সংখ্যাগুলি তাঁর নিজের বক্তব্যে দেওয়া অভিযোগ; এর স্বাধীন যাচাই বা সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নিয়ে তিনি সাংবাদিক বৈঠকে বিস্তারিত তথ্য দেননি।
ভোট-পরবর্তী হিংসায় ঘরছাড়া মানুষদের প্রসঙ্গও তোলেন তৃণমূল নেত্রী। তাঁর বক্তব্য, কলকাতা হাই কোর্ট ঘরছাড়াদের ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলেও পুলিশ সেই নির্দেশ কার্যকর করছে না। থানায় ফোন করেও আক্রান্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো নির্দেশ নেই বলে তাঁকে জানানো হচ্ছে—এমন অভিযোগও করেন মমতা। শুধু দলীয় কর্মীদের নয়, নিজের নিরাপত্তা নিয়েও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, তাঁর বাড়ির সামনেও প্রতি রাতে ২০০ থেকে ৩০০ জন এসে চিৎকার ও বিশৃঙ্খলা করছে। পাশাপাশি সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে হামলা, মহুয়া মৈত্র, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও কুণাল ঘোষকে ঘিরে হামলার অভিযোগও তোলেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে মমতার অভিযোগের আরেকটি বড় বিষয় ছিল ইভিএম। দক্ষিণ কলকাতার একটি জায়গায় আগুন লেগে প্রায় ৪ হাজার ইভিএম নষ্ট হওয়ার ঘটনাকে তিনি ‘রহস্যজনক’ বলে উল্লেখ করেন। তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, ওই ইভিএমগুলির অনেকগুলি এমন আসনে ব্যবহৃত হয়েছিল, যেগুলির নির্বাচন নিয়ে এখনও মামলা চলছে।
কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ডিজি সীমা খান্নার ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে তোলেন মমতা। তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ করেছেন। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ECINET সফটওয়্যার এবং ভোটার তালিকায় কার নাম থাকবে, সেই বিষয়ে নির্বাচনী আধিকারিকদের আইনগত ক্ষমতার ওপর তার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন।
দিল্লির সাংবাদিক বৈঠকে কংগ্রেস প্রসঙ্গও ওঠে। আগের দিন INDIA জোটের বৈঠকে সনিয়া গান্ধীর সঙ্গে মমতার সৌহার্দ্যপূর্ণ ছবি প্রকাশ্যে এলেও কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরীর তৃণমূলে ফিরে আসার আহ্বান নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মমতা তা এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, ‘এই স্তরের প্রশ্ন’ না করতে এবং স্থানীয় প্রশ্নের উত্তর স্থানীয় ভাবেই দেবেন। তবে INDIA জোট নিয়ে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করেন মমতা। রাহুল গান্ধীকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি সমর্থন করেছেন কি না, জানতে চাইলে তাঁর বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী ঠিক করা কোনও এক ব্যক্তির সিদ্ধান্ত নয়, এটি জোটের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত।
এর পরেই বিজেপি সরকারকে নিয়েও বড় দাবি করেন মমতা। তাঁর কথায়, বিজেপি সরকার ২০২৯ পর্যন্ত টিকবে কি না, তা নিয়ে তাঁর বিশ্বাস নেই। দুই, চার বা ছয় মাস—সরকার কতদিন থাকবে, তা তিনি জানেন না বলেও মন্তব্য করেন। তবে ‘খুব শিগগিরই ভালো খবর’ আসবে বলে দাবি করেন তিনি।জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতেও অনড় থাকেন মমতা। তাঁর বক্তব্য, এই দাবি বাস্তবসম্মত এবং শেষ পর্যন্ত দেশের মানুষই বিষয়টি দেখবেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, আগের নির্বাচনে ‘ম্যানিপুলেশন’-এর মাধ্যমে বিজেপি জয় পেয়েছিল।
নির্বাচনী পরাজয়ের পর দিল্লিতে মমতার এই সাংবাদিক বৈঠক তাই একাধিক রাজনৈতিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, ভোটার তালিকা ও ইভিএম নিয়ে অভিযোগ, ভোট-পরবর্তী হিংসা এবং INDIA জোটের ভবিষ্যৎ। আপাতত জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিকেই নিজের বক্তব্যের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে সামনে রেখেছেন তৃণমূল নেত্রী।