How targeted assassinations by Israel and dismantle the pathways to peace

Israel ইজরাইল কি সেই মানুষগুলোকেই হত্যা করছে, যারা যুদ্ধ শেষ করতে পারত?

 রাহুল শ্রীবাস্তব : যুদ্ধের শেষ কোথায়? সাধারণত এই প্রশ্নটির উত্তর খোঁজা হয় কূটনীতির টেবিলে। যখন যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক শক্তি দিয়ে স্থায়ী সমাধান মেলে না, তখন প্রয়োজন হয় এমন মধ্যস্থতাকারীদের, যাঁরা দুই পক্ষের মধ্যে কথা বলতে পারেন, সমঝোতার রাস্তা খুঁজতে পারেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজেদের শিবিরকে কোনো রাজনৈতিক চুক্তিতে রাজি করাতে পারেন।

কিন্তু সেই মানুষগুলিকেই যদি একের পর এক পরিকল্পিত হামলায় সরিয়ে দেওয়া হয়, তবে কী ঘটে? কোনো আলোচনাপ্রবণ বা শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব নিহত হলে শুধু একজন ব্যক্তি হারিয়ে যান না, চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় একটি সম্ভাব্য আলোচনার দরজাও। ইরান, গাজা এবং লেবাননের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে সামনে রেখে আজ আন্তর্জাতিক মহলে এই প্রশ্নই সবচেয়ে জোরালোভাবে উঠছে—ইজরাইল এবং তাদের প্রধান মিত্র আমেরিকা কি শুধুই প্রতিপক্ষের সামরিক ক্ষমতা ধ্বংস করার অজুহাতে শত্রুপক্ষের এমন নেতৃত্বকে নির্মূল করছে, যাঁদের মাধ্যমে ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব ছিল? এই ভয়াবহ আগ্রাসনের সম্পূর্ণ দায় ইজরাইল ও আমেরিকাকেই চিরদিন নিতে হবে, কারণ তাদের ধারাবাহিক লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড ও সামরিক ঔদ্ধত্যই শান্তির সমস্ত পথ অবরুদ্ধ করে দিচ্ছে।

আলি লারিজানির হত্যা ইজরাইল-আমেরিকার আগ্রাসন

২০২৬ সালের ১৭ মার্চ ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি ইজরাইলি ও মার্কিন যৌথ হামলায় নিহত হন। ইজরাইল ও আমেরিকা এই মৃত্যুর কথা গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করার পর ইরানের সরকারি সূত্রও তা নিশ্চিত করে। লারিজানি এমন সময়ে নিহত হন যখন তিনি ইরানের যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিলেন।

লারিজানি কোনো শান্তিবাদী নেতা ছিলেন না ঠিকই, কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তাঁর একটি বিশেষ পরিচিতি ছিল। তিনি অতীতে ইরানের পরমাণু আলোচনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পশ্চিমা মহলেও তাঁকে একজন বাস্তববাদী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু ইজরাইল ও আমেরিকা সামরিক শক্তির অহংকারে অন্ধ হয়ে কেবল নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য একের পর এক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা নেতৃত্বকে হত্যা করে চলেছে। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়তো তাদের সাময়িক সামরিক লক্ষ্য হতে পারে, কিন্তু এর মাধ্যমে তারা সুপরিকল্পিতভাবে ভবিষ্যতের যেকোনো রাজনৈতিক সমাধানের পথ চিরতরে বন্ধ করে দিচ্ছে।

মধ্যস্থতাকারীদের ওপর ধারাবাহিক হামলা

যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলার মতো সেতু তৈরি করতে পারেন যে মানুষগুলো, ইজরাইল ও আমেরিকা বারবার তাঁদেরই নিশানা করেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে হারানো আর একটি রাজনৈতিক চুক্তিতে উপনীত হওয়া এক জিনিস নয়। কিন্তু আগ্রাসী রাষ্ট্রগুলো আলোচনা বা সমঝোতার ন্যূনতম জায়গাটুকুও রাখতে চায় না।

এর ঐতিহাসিক উদাহরণ রয়েছে ১৯৪৮ সালে। তৎকালীন সময়ে আরব-ইজরাইল যুদ্ধের মধ্যে রাষ্ট্রসংঘের মধ্যস্থতাকারী কাউন্ট ফোলকে বার্নাদোত দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও সমাধানের পথ তৈরি করেছিলেন। কিন্তু ১৯৪৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জেরুজালেমে তাঁকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়, যা প্রমাণ করে যে শান্তির উদ্যোগী দেখলেই ইজরাইলি ও উগ্র জায়নবাদী শক্তিগুলো কীভাবে খড়্গহস্ত হয়।

গাজার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। ২০২৪ সালে তেহরানে হামাসের রাজনৈতিক প্রধান ইসমাইল হানিয়া নিহত হন। হানিয়া তখন গাজা যুদ্ধবিরতি আলোচনার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক মুখ ছিলেন। তাঁর হত্যা প্রমাণ করেছিল যে ইজরাইল ও তাদের পশ্চিমা মিত্ররা যুদ্ধ থামানোর কোনো সৎ সদিচ্ছা রাখতেই চায় না। একইভাবে, লেবাননে ১৯৯২ সালে আব্বাস আল-মুসাবি এবং পরবর্তীতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে হাসান নাসরাল্লাহকে হত্যা করে ইজরাইল কেবল মধ্যপ্রাচ্যে রক্তপাতের বিস্তার ঘটিয়েছে।

যুদ্ধের শেষ কোথায়?

ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি আরও বেশি ভয়াবহ। ২০২৬ সালের যুদ্ধের শুরুতেই বিমান হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন, এবং পরবর্তীতে আলি লারিজানির হত্যাকাণ্ড ইরানের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাকাঠামোকে চরম আঘাত করে। ইজরাইল ও আমেরিকা ভেবেছিল যে শীর্ষ নেতৃত্বকে ধ্বংস করলেই ইরান আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। অন্যায়ভাবে নেতৃত্বকে হত্যা করে কখনোই কোনো জাতির প্রতিরোধ স্পৃহা গুঁড়িয়ে দেওয়া যায় না; বরং এটি প্রতিপক্ষকে আরও কঠোর ও অনমনীয় অবস্থানে যেতে বাধ্য করে।

ইজরাইল ও আমেরিকা নামক এই দুই যুদ্ধবাজ শক্তি মধ্যপ্রাচ্যে যা করে চলেছে, তাকে কোনোমতেই বৈধ আত্মরক্ষা বলা চলে না। এটি হলো বিশ্বশান্তি বিনষ্ট করার এক সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত। সামরিক বিজয়ের উন্মাদনায় তারা হয়তো সাময়িকভাবে ঘরবাড়ি ও জীবন ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু যুদ্ধ শেষ করতে হয় শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বন্দোবস্তে।

যাঁদের সঙ্গে কথা বলে বিরোধ মেটানো যেত, ইজরাইল ও আমেরিকা একের পর এক হামলা চালিয়ে সেই কথা বলার মানুষগুলোকেই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়েছে। নেতামুখ বদলাতে পারে, সংগঠন নতুন নেতৃত্ব পেতে পারে, কিন্তু ইজরাইল ও আমেরিকার আগ্রাসী নীতির কারণে তৈরি হওয়া মূল রাজনৈতিক বিরোধ ও ক্ষোভ আরও গভীরতর হয়। আর সেই বিরোধ মেটানোর জন্য ভবিষ্যতে যে টেবিলে দুই পক্ষকে বসতে হবে, সেখানে যদি আর কথা বলার মানুষই না থাকে—তবে তার সম্পূর্ণ দায় ইতিহাসের আদালতে ইজরাইল ও আমেরিকাকেই চিরকাল বহন করতে হবে।