শিলাজিৎ নিয়ে মানুষের আগ্রহ নতুন নয়। আয়ুর্বেদে বহুদিন ধরেই এই কালচে, আঠালো পদার্থকে শরীরের দুর্বলতা কমানো ও শক্তি বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করা হয়ে আসছে। বর্তমানে বাজারে শিলাজিৎকে শারীরিক শক্তি, যৌনক্ষমতা, পুরুষের টেস্টোস্টেরন, প্রজননক্ষমতা, ক্লান্তি কমানো এবং কর্মক্ষমতা বাড়ানোর মতো নানা দাবিতে বিক্রি করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই দাবিগুলির কতটা সত্যিই বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত?
শিলাজিৎ মূলত পাহাড়ি পাথরের ফাটল থেকে পাওয়া একটি জৈব-খনিজ পদার্থ। এতে ফুলভিক অ্যাসিড, হিউমিক উপাদান এবং বিভিন্ন খনিজ থাকে। গবেষণাগারে এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহ কমানোর মতো কিছু জৈবিক কার্যকলাপ দেখা গিয়েছে। তবে ল্যাবরেটরি বা প্রাণীর ওপর পাওয়া ফলাফল সরাসরি মানুষের শরীরে একইভাবে কাজ করবে—এমনটা ধরে নেওয়া যায় না।
পুরুষের যৌনক্ষমতা ও টেস্টোস্টেরন বাড়াতে শিলাজিৎ কতটা কার্যকর? এই দাবিই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি প্রচারিত। কিছু ছোট মানব-গবেষণায় শিলাজিৎ ব্যবহারের পর নির্দিষ্ট হরমোন বা প্রজনন-সংক্রান্ত সূচকে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে গবেষণার সংখ্যা কম এবং অংশগ্রহণকারীর সংখ্যাও সীমিত। তাই শিলাজিৎকে যৌনক্ষমতা বৃদ্ধির নিশ্চিত ওষুধ হিসেবে দাবি করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনও নেই। বিশেষ করে যৌন দুর্বলতা বা বন্ধ্যত্বের চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহার করা উচিত নয়।
শারীরিক শক্তি ও ক্লান্তি কমানোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। শিলাজিৎকে অনেক সময় ‘ন্যাচারাল এনার্জি বুস্টার’ হিসেবে প্রচার করা হয়। এর কিছু উপাদান শরীরের শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে বলে গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে। কিন্তু সুস্থ মানুষের দৈনন্দিন কর্মক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়—এমন শক্তিশালী ক্লিনিক্যাল প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।
তাহলে কি শিলাজিৎ একেবারেই উপকারী নয়? তা বলা ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, কিছু সম্ভাব্য উপকারের প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে, কিন্তু নিশ্চিত স্বাস্থ্য-উপকার প্রমাণের জন্য আরও বড় ও ভালো মানের মানব-গবেষণা প্রয়োজন। ২০২৬ সালের একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনাতেও শিলাজিৎ নিয়ে ক্যানসার-সংক্রান্ত গবেষণাগুলিকে মূলত প্রাক-ক্লিনিক্যাল পর্যায়ের বলে উল্লেখ করা হয়েছে; মানুষের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল না থাকায় ক্যানসারের চিকিৎসা হিসেবে এর ব্যবহারকে প্রমাণিত বলা যায় না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল শিলাজিৎয়ের নিরাপত্তা। কাঁচা বা অপরিশোধিত শিলাজিৎ-এ সীসা, পারদ, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, থ্যালিয়ামের মতো ভারী ধাতু এবং জীবাণু থাকার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে বাজার থেকে যেকোনও শিলাজিৎ কিনে খাওয়া নিরাপদ নয়। পরিশোধিত এবং স্বাধীন পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা পণ্য ব্যবহার করাই তুলনামূলকভাবে নিরাপদ পদ্ধতি।
অর্থাৎ, শিলাজিৎকে ‘সব রোগের ওষুধ’ বা নিশ্চিত যৌনশক্তিবর্ধক হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কিছু ক্ষেত্রে উপকারের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে, কিন্তু প্রচারে যে মাত্রার দাবি করা হয়, বর্তমান বৈজ্ঞানিক প্রমাণ তার সবটা সমর্থন করে না। বিশেষ করে নিয়মিত ওষুধ খেলে বা কোনও শারীরিক সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শিলাজিৎ শুরু না করাই ভালো।