The NewsNest Desk: গাজায় ইসরাইলেরর সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরেই সরব নাভি পিল্লাই। ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে তাঁর সেই অবস্থান। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত এক মতামতধর্মী নিবন্ধে রাষ্ট্রসংঘের তদন্ত কমিশনের তৎকালীন চেয়ারপার্সন পিল্লাই স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন, কোনও অপরাধই গণহত্যাকে ন্যায্যতা দিতে পারে না। গাজায় প্যালেস্তিনীয়দের বিরুদ্ধে ইসরাইল গণহত্যা চালিয়েছে বলে কমিশন যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল, তার পক্ষে যুক্তিও তুলে ধরেছিলেন তিনি।
দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত পরিবারে জন্ম নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাইয়ের। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক আদালতে মানবাধিকার রক্ষা—দীর্ঘ কর্মজীবনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার থাকার পাশাপাশি রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক হিসাবেও কাজ করেছেন। গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের বিচার ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের।
গাজায় গণহত্যার অভিযোগে কী বলেছিলেন পিল্লাই?
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের নিবন্ধে পিল্লাই জানিয়েছিলেন, গাজা নিয়ে রাষ্ট্রসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন তথ্য ও প্রমাণ খতিয়ে দেখেছিল। সেই তদন্তের ভিত্তিতেই কমিশন সিদ্ধান্তে পৌঁছয় যে, গাজায় প্যালেস্তিনীয়দের বিরুদ্ধে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। তবে এটি ছিল তদন্ত কমিশনের মূল্যায়ন, কোনও আদালতের চূড়ান্ত রায় নয়। ইসরাইল এই অভিযোগ ও রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেছে।
গণহত্যা শব্দটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতার কথাও তুলে ধরেছিলেন পিল্লাই। রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচারে তাঁর ভূমিকার উল্লেখ করে তিনি বুঝিয়েছিলেন, এই শব্দের গুরুত্ব ও আইনি তাৎপর্য সম্পর্কে তিনি যথেষ্ট অবহিত। তাই হালকাভাবে এমন অভিযোগ তোলার প্রশ্নই ওঠে না বলে তাঁর বক্তব্য ছিল।
গাজায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া হাসপাতাল, বসতবাড়ি ও জনপদ, খাদ্যাভাব, অনাহার এবং মাতৃস্বাস্থ্য পরিষেবার ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতির কথাও নিবন্ধে উল্লেখ করেছিলেন তিনি। তাঁর মতে, এই ঘটনাগুলিকে নিছক যুদ্ধের অনিবার্য পরিণতি হিসাবে দেখলে চলবে না। বরং প্যালেস্তিনীয় জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ও ভবিষ্যতের উপর তার প্রভাব খতিয়ে দেখা জরুরি।
হামাসের হামলার প্রসঙ্গও তুলেছিলেন
নিজের বক্তব্যে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলের উপর হামাসের হামলা এবং সেই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইসরাইলি পরিবারগুলির দুর্দশার কথাও এড়িয়ে যাননি পিল্লাই। হামাসের অপরাধগুলিও তদন্ত কমিশন নথিভুক্ত করেছে বলে জানিয়েছিলেন তিনি। তবে তাঁর বক্তব্য, একটি পক্ষের অপরাধ অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে গণহত্যাকে বৈধতা দিতে পারে না।
পিল্লাইয়ের মতে, নৃশংসতার জবাবে আরও নৃশংসতার পথ বেছে নেওয়া হলে আন্তর্জাতিক আইন যে মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা করতে চায়, তা-ই বিপন্ন হয়। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, যুদ্ধের ভয়াবহতা বিচার করার ক্ষেত্রে কোনও পক্ষের পরিচয় নয়, বরং অপরাধের প্রকৃতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের বিধানই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলির প্রতিও বার্তা
গাজায় মানবিক বিপর্যয় বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকার উপর জোর দিয়েছিলেন পিল্লাই। যে দেশগুলি ইসরাইলকে অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা দেয়, তাদেরও নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য ছিল, অবাধে মানবিক সাহায্য পৌঁছনোর ব্যবস্থা করতে হবে এবং প্যালেস্তিনীয়দের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ও ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ করতে হবে। নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পরও গাজা নিয়ে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি পিল্লাই। সত্য কথা বলার জন্য সাহসের প্রয়োজন কেন, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। তাঁর মতে, গণহত্যা প্রতিরোধ করা রাষ্ট্রগুলির ইচ্ছাধীন কোনও বিষয় নয়; এটি আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে বিলম্বের সুযোগ নেই।পিল্লাইয়ের এই বক্তব্য ফের একবার আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং গাজায় চলতে থাকা মানবিক সংকট নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। তাঁর অবস্থানের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—যুদ্ধ বা প্রতিশোধের যুক্তি দেখিয়ে কি কোনও জনগোষ্ঠীর ধ্বংসকে মেনে নেওয়া যায়? পিল্লাইয়ের উত্তর স্পষ্ট: কোনও অপরাধই গণহত্যাকে ন্যায্যতা দিতে পারে না।
আরও পড়ুন: Houthi Attack: হুথি হামলার ছবি – ভিডিও পোস্ট নয়, সৌদিতে থাকা ভারতীয়দের সতর্কবার্তা দিল নয়াদিল্লির