Jitiya Puja 2026: A long-standing Bihar tradition continues inside Bardhaman court premises

Jitiya Puja 2026: বর্ধমান কোর্টে জিতিয়া পুজো: বদলে যাওয়া ভূগোলেও বেঁচে আছে বিহারি সমাজের পুরনো পরম্পরা

সুস্মিতা পান ও রাহুল ঘোষাল:   শহর বদলায়। বদলে যায় রাস্তা, বাড়িঘর, পুকুরের পাড়, এমনকি একটি এলাকার চেনা ভূগোলও। কিন্তু মানুষের কিছু স্মৃতি আর কিছু পরম্পরা এত সহজে বদলায় না। তারই সাক্ষী হয়ে রইল বর্ধমান কোর্টের জিতিয়া পুজো।
আজ বর্ধমান কোর্ট কম্পাউন্ডে অনুষ্ঠিত হল জিতিয়া পুজো। মূলত বিহারি সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় পরম্পরা হলেও দীর্ঘদিন ধরে এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বর্ধমান আদালত চত্বরের নিজস্ব একটি ইতিহাস। বহু বছর ধরে কোর্ট কম্পাউন্ডের পুকুরঘাট সংলগ্ন এলাকায় জিতিয়া পুজোর আয়োজন হয়ে আসছে। সময়ের সঙ্গে সেই এলাকার চেহারা বদলেছে। বদলেছে ভূখণ্ডের নকশা। আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুরনো পুজোর স্থানও কার্যত এসে পড়েছে আদালত প্রাঙ্গণের ভিতরে।

তবে স্থান বদলালেও বদলায়নি মানুষের বিশ্বাস। জিতিয়া পুজো, যাকে জীবিতপুত্রিকা ব্রতও বলা হয়, বিহার, ঝাড়খণ্ড ও উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রত। সন্তানদের মঙ্গল ও দীর্ঘায়ু কামনায় মায়েরা এই ব্রত পালন করেন। সরকারি পর্যটন তথ্য অনুযায়ী, আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিকে কেন্দ্র করে এই ব্রত পালিত হয় এবং বহু ক্ষেত্রে কঠোর উপবাসের রীতি রয়েছে।

বিহারের সংস্কৃতিতে জিতিয়া শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি বহু পরিবারের কাছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরম্পরা। কোথাও বাড়ির উঠোনে, কোথাও পুকুরের ঘাটে, আবার কোথাও নির্দিষ্ট পুজোর স্থানে এই ব্রতকে ঘিরে তৈরি হয় উৎসবের পরিবেশ।
বর্ধমান কোর্টের জিতিয়া পুজোর গল্পটাও যেন সেই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরম্পরারই একটি স্থানীয় অধ্যায়। একসময় কোর্টের পুকুরঘাট সংলগ্ন যে জায়গায় পুজো হত, আজ সেই পরিসর আর আগের মতো নেই। আদালত চত্বরের বিস্তার, নির্মাণ ও সময়ের পরিবর্তনে বদলে গিয়েছে চারপাশের দৃশ্যপট। ফলে আজ জিতিয়া পুজোর আয়োজন বলতে গেলে বর্ধমান কোর্টের প্রাঙ্গণেই।

একটি পুজোর ঠিকানা কীভাবে একটি শহরের পরিবর্তনের গল্প বলে দিতে পারে, বর্ধমান কোর্টের জিতিয়া তারই উদাহরণ। কারণ কোনও শহরের ইতিহাস শুধু পুরনো বাড়ি, রাস্তা কিংবা সরকারি নথির মধ্যে লেখা থাকে না। মানুষের উৎসবও সেই ইতিহাসের অংশ। কোন পাড়ায় কোন পুজো হত, কোন ঘাটে মানুষ একসঙ্গে জড়ো হতেন, কোন উৎসবের দিনে দূর থেকে আত্মীয়রা আসতেন—এই ছোট ছোট স্মৃতির মধ্যেই তৈরি হয় একটি শহরের সামাজিক ইতিহাস। বর্ধমানেও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের উৎসব ও সংস্কৃতিকে সঙ্গে নিয়ে বসবাস করছেন। বিহার থেকে বাংলায় এসে বসতি গড়া মানুষেরাও তাঁদের নিজস্ব উৎসবের পরম্পরা ধরে রেখেছেন। সময়ের সঙ্গে তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম বর্ধমানেরই অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু জিতিয়ার মতো উৎসব তাঁদের শিকড়ের সঙ্গে যোগাযোগের একটি পথ তৈরি করে দেয়।

আজকের জিতিয়া পুজো তাই শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। এর মধ্যে রয়েছে মায়ের প্রার্থনা, পরিবারের মঙ্গলকামনা এবং একইসঙ্গে রয়েছে একটি পুরনো সামাজিক স্মৃতির ধারাবাহিকতা। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়, এই পুজোর সঙ্গে জায়গাটির সম্পর্কও সময়ের সাক্ষ্য বহন করছে। যে পুকুরঘাট একসময় পুজোর পরিচিত ঠিকানা ছিল, আজ সেই একই পরিসর বৃহত্তর আদালত চত্বরের অংশ। এক অর্থে বলা যায়, জিতিয়া পুজোর স্থান বদলেছে, কিন্তু পরম্পরা বদলায়নি। এমন অনেক উৎসব রয়েছে, যেগুলি বড় শহরের আলোচনায় খুব বেশি আসে না। কিন্তু স্থানীয় সমাজের কাছে সেগুলির গুরুত্ব গভীর। কারণ এগুলি কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত নয়, মানুষের পারিবারিক স্মৃতি, সামাজিক পরিচয় এবং শিকড়ের সঙ্গেও জড়িয়ে থাকে।
বর্ধমান কোর্টের জিতিয়া পুজোও তেমনই একটি পরম্পরা।

আজ আদালতের ব্যস্ত পরিবেশের মধ্যেই যখন জিতিয়া পুজোর আয়োজন হল, তখন বর্তমান আর অতীত যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে গেল। একদিকে আধুনিক আদালত চত্বর, অন্যদিকে বহু বছর ধরে চলে আসা একটি লোকাচার। চারপাশের ভূগোল বদলে গেলেও মানুষের বিশ্বাস যে নিজের মতো করে জায়গা তৈরি করে নিতে পারে, বর্ধমান কোর্টের জিতিয়া পুজো তারই একটি সুন্দর উদাহরণ। শহর এগিয়ে যায়। পুরনো জায়গা হারিয়ে যায়। নতুন স্থাপনা তৈরি হয়। কিন্তু কিছু পরম্পরা সেই পরিবর্তনের মধ্যেও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। বর্ধমান কোর্টের জিতিয়া পুজো যেন সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়—ভূখণ্ডের নকশা বদলাতে পারে, কিন্তু মানুষের স্মৃতির মানচিত্র এত সহজে মুছে যায় না।