ডেটিংয়ের দুনিয়ায় প্রেম পাওয়ার জন্য মানুষ কত রকম কৌশলই না ব্যবহার করেন! কেউ সাজগোজে জোর দেন, কেউ দামি পারফিউম ব্যবহার করেন, আবার কেউ শরীরের স্বাভাবিক গন্ধকে আকর্ষণের অস্ত্র হিসেবে তুলে ধরছেন। সমাজমাধ্যমে এখন এমনই এক অদ্ভুত প্রবণতা নিয়ে আলোচনা চলছে, যার নাম ‘Pheromone Maxxing’। এই প্রবণতায় কিছু তরুণ পুরুষ ইচ্ছাকৃতভাবে কম স্নান করা, ডিওডোরেন্ট ব্যবহার না করা কিংবা ঘামে ভেজা পোশাক পরার মতো অভ্যাসকে ‘প্রাকৃতিক আকর্ষণ’ তৈরির উপায় হিসেবে দেখাচ্ছেন।
মূল ধারণাটি বেশ সরল। প্রচলিত সৌন্দর্যচর্চার বদলে শরীরের স্বাভাবিক গন্ধকে নাকি আরও ‘আকর্ষণীয়’ করে তোলা যায়। এই ধারণার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে ফেরোমোন-এর তত্ত্ব। প্রাণিজগতে ফেরোমোন এমন রাসায়নিক সংকেত, যা একই প্রজাতির অন্য প্রাণীর আচরণ বা প্রজনন-সংক্রান্ত প্রতিক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। সেখান থেকেই মানুষের ক্ষেত্রেও শরীরের গন্ধ যৌন আকর্ষণ তৈরি করতে পারে—এমন ধারণা ছড়িয়েছে ইন্টারনেটে।
কী এই ‘Pheromone Maxxing’?
২০২৬ সালে টিকটক ও অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমের কিছু অ্যাকাউন্টে ‘Pheromone Maxxing’ নিয়ে নানা ভিডিয়ো ছড়াতে শুরু করে। এই প্রবণতার অনুসারীদের একাংশের দাবি, অতিরিক্ত সাবান, পারফিউম বা ডিওডোরেন্ট ব্যবহার করে শরীরের স্বাভাবিক গন্ধ ঢেকে ফেলার বদলে সেটিকে বজায় রাখাই নাকি আকর্ষণ বাড়ানোর উপায়। কেউ কেউ নিয়মিত স্নান না করা বা ঘামে ভেজা পোশাক পুনরায় পরার মতো চরম পদ্ধতির কথাও প্রচার করছেন।
তবে এই প্রবণতার সব ভিডিয়ো যে সত্যিই বিশ্বাস থেকে তৈরি, তা নিশ্চিত নয়। কিছু কনটেন্ট ব্যঙ্গ, রসিকতা বা ‘রেজ বেট’—অর্থাৎ ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে ক্ষুব্ধ করে বেশি প্রতিক্রিয়া পাওয়ার কৌশল হিসেবেও তৈরি হতে পারে। ফলে সমাজমাধ্যমে দেখা প্রতিটি দাবি বাস্তব আচরণের প্রতিনিধিত্ব করে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ঘামের গন্ধ কি সত্যিই নারীদের আকর্ষণ করে?
এখানেই রয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বিজ্ঞানীরা মানুষের শরীরের গন্ধ এবং সামাজিক বা যৌন আকর্ষণের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। মানুষের গন্ধ যে অন্য মানুষের অনুভূতি বা পছন্দে কোনও প্রভাবই ফেলে না—এমনটা বলা যায় না। কিন্তু সেখান থেকে ‘ঘর্মাক্ত শরীরের গন্ধ নারীদের যৌনভাবে আকর্ষণ করে’ অথবা ‘না-স্নান করলেই প্রেমে পড়বেন নারীরা’—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনও নেই।
অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাম্প্রতিক ব্যাখ্যাতেও বলা হয়েছে, মানুষের ক্ষেত্রে এমন কোনও রাসায়নিককে এখনও নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়নি, যাকে প্রাণিজগতের পরিচিত অর্থে মানব ফেরোমোন বলা যায়। মানুষের শরীরে ফেরোমোন শনাক্ত ও গ্রহণ করার নির্দিষ্ট জৈবিক ব্যবস্থার অস্তিত্ব নিয়েও যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।
গবেষকদের মতে, তাজা ঘাম নিজে খুব একটা দুর্গন্ধযুক্ত নয়। শরীরের ঘাম দীর্ঘ সময় ত্বকে থাকলে ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে তার মিথস্ক্রিয়ায় যে গন্ধ তৈরি হয়, সেটিই মূলত শরীরের দুর্গন্ধের কারণ। তাই ‘ঘাম যত বেশি, আকর্ষণ তত বেশি’—এই সরল সমীকরণের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
তাহলে শরীরের গন্ধের কোনও ভূমিকা নেই?
বিষয়টি এতটা সরলও নয়। মানুষের গন্ধ সম্পর্কে ব্যক্তিগত পছন্দ, পরিচিতি, স্মৃতি এবং আবেগের ভূমিকা থাকতে পারে। কারও শরীরের স্বাভাবিক গন্ধ তাঁর সঙ্গীর কাছে ভালো লাগতে পারে, আবার অন্য কারও কাছে একই গন্ধ অপ্রীতিকর হতে পারে। অর্থাৎ গন্ধ পছন্দ হওয়া আর কোনও নির্দিষ্ট ‘সেক্স ফেরোমোন’ মানুষের আকর্ষণ নিয়ন্ত্রণ করা—দুটি এক জিনিস নয়।
মানুষের শরীরের গন্ধ, জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং সঙ্গী নির্বাচনের মধ্যে সম্পর্ক আছে কি না, তা নিয়েও অতীতে বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে। কিন্তু সব গবেষণার ফল এক নয়। ২০২০ সালের একটি মেটা-বিশ্লেষণে মানুষের শরীরের গন্ধ এবং MHC জিনের পার্থক্যের মধ্যে সঙ্গী নির্বাচনের নির্দিষ্ট সামগ্রিক প্রভাবের পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ফলে সমাজমাধ্যমের ‘Pheromone Maxxing’ এখন মূলত একটি ইন্টারনেট ট্রেন্ড, বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ডেটিং কৌশল নয়। শরীরের স্বাভাবিক গন্ধ মানুষের আকর্ষণে কিছুটা ভূমিকা রাখতে পারে কি না, তা নিয়ে গবেষণা চললেও শুধু স্নান না করে বা ডিওডোরেন্ট ব্যবহার বন্ধ করে বিপরীত লিঙ্গকে আকর্ষণ করার দাবি এখনও প্রমাণিত নয়।