মা হওয়ার খবর জানার পর থেকেই অনাগত সন্তানকে ঘিরে শুরু হয় নানা চিন্তা। গর্ভস্থ শিশুর হৃদযন্ত্র ঠিকমতো তৈরি হচ্ছে তো? হার্টে কোনও জন্মগত ত্রুটি নেই তো? এমন প্রশ্ন অনেক হবু মায়ের মনেই আসে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে এখন গর্ভাবস্থাতেই শিশুর হৃদযন্ত্রের গঠন ও কাজকর্ম সম্পর্কে অনেকটাই ধারণা পাওয়া সম্ভব। নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে সম্ভাব্য হৃদযন্ত্রের সমস্যা আগেভাগে শনাক্ত করা যায়।
কখন ভ্রূণের হৃদযন্ত্র পরীক্ষা করা হয়?
গর্ভাবস্থায় নিয়মিত অ্যানোমালি স্ক্যান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত ১৮ থেকে ২২ সপ্তাহের মধ্যে এই আল্ট্রাসাউন্ড করা হয়। এই পরীক্ষায় শিশুর মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ড, কিডনি-সহ বিভিন্ন অঙ্গের পাশাপাশি হৃদযন্ত্রের গঠনও দেখা হয়। হৃদযন্ত্রের চারটি প্রকোষ্ঠ, প্রধান রক্তনালির অবস্থান এবং হৃদস্পন্দনের মতো বিষয়ও পরীক্ষা করা হয়।
তবে সাধারণ অ্যানোমালি স্ক্যানে কোনও অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লে বা গর্ভাবস্থাকে উচ্চঝুঁকির বলে মনে হলে চিকিৎসক আরও বিস্তারিত পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন।
কী ফিটাল ইকোকার্ডিওগ্রাফি?
ভ্রূণের হৃদযন্ত্রের বিস্তারিত পরীক্ষা করার জন্য রয়েছে ফিটাল ইকোকার্ডিওগ্রাফি। এটি বিশেষ ধরনের আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষা, যার মাধ্যমে গর্ভস্থ শিশুর হৃদযন্ত্রের গঠন, হৃদস্পন্দন এবং রক্তপ্রবাহ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়।
সব গর্ভবতী মহিলার এই পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। তবে পরিবারে জন্মগত হৃদরোগের ইতিহাস, আগের সন্তানের জন্মগত হৃদযন্ত্রের সমস্যা, কিছু মাতৃস্বাস্থ্যজনিত ঝুঁকি বা সাধারণ স্ক্যানে সন্দেহজনক কিছু ধরা পড়লে চিকিৎসক ফিটাল ইকো করার পরামর্শ দিতে পারেন।
ডপলার আল্ট্রাসাউন্ডের ভূমিকা
প্রয়োজন অনুযায়ী ডপলার আল্ট্রাসাউন্ড করা হয়। এর মাধ্যমে ভ্রূণের রক্তপ্রবাহ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। বিশেষ করে গর্ভাবস্থার শেষ দিকে শিশুর বৃদ্ধি বা রক্তসঞ্চালন নিয়ে কোনও উদ্বেগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে এই পরীক্ষা করা হতে পারে।
NST কি ভ্রূণের হার্ট পরীক্ষা?
গর্ভাবস্থার পরবর্তী পর্যায়ে নন-স্ট্রেস টেস্ট বা NST-এর মাধ্যমে শিশুর হৃদস্পন্দনের সঙ্গে তার নড়াচড়ার সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করা যায়। সাধারণত নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বা প্রসবের আগে শিশুর সুস্থতা পর্যবেক্ষণের জন্য চিকিৎসক এই পরীক্ষা করতে বলেন। এটি ভ্রূণের জন্মগত হৃদযন্ত্রের গঠনগত ত্রুটি শনাক্ত করার পরীক্ষা নয়।
কারা বেশি সতর্ক থাকবেন?
যাঁদের পরিবারে জন্মগত হৃদরোগের ইতিহাস রয়েছে, আগের সন্তানের জন্মগত হৃদযন্ত্রের সমস্যা ছিল, অথবা গর্ভাবস্থায় চিকিৎসক কোনও ঝুঁকির ইঙ্গিত পেয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। মায়ের কিছু শারীরিক সমস্যা বা নির্দিষ্ট ওষুধ ব্যবহারের ইতিহাসও চিকিৎসকের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—প্রতিটি গর্ভাবস্থায় সব পরীক্ষা করানো প্রয়োজন হয় না। কোন পরীক্ষা কখন প্রয়োজন, তা গর্ভাবস্থার সপ্তাহ, মায়ের স্বাস্থ্য এবং শিশুর সম্ভাব্য ঝুঁকি দেখে চিকিৎসক ঠিক করেন। কোনও স্ক্যানে সন্দেহজনক কিছু ধরা পড়লেই যে শিশুর হৃদযন্ত্রে নিশ্চিত সমস্যা রয়েছে, এমনও নয়। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আরও পরীক্ষা করে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তাই গর্ভাবস্থায় নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো কোনও সমস্যা ধরা পড়লে পরবর্তী পর্যায়ের চিকিৎসা ও প্রসবের পরিকল্পনাও অনেক বেশি সুশৃঙ্খলভাবে করা সম্ভব।