Chorbagan Stampede: 19 Dead as Chorbagan Tragedy Shatters 16 Families

Chorbagan Stampede: বাবা-ছেলে থেকে স্বামী-স্ত্রী! চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু, শোকে স্তব্ধ ১৬টি পরিবার

The NewsNest Desk: দুর্গাপুজোর আনন্দ মুহূর্তে পরিণত হল শোকে। সপ্তমীর সন্ধ্যায় কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজো মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারালেন ১৯ জন। ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে আর বাড়ি ফেরা হল না কারও। মৃতদের মধ্যে রয়েছেন বাবা-ছেলে, স্বামী-স্ত্রী, মা-ছেলে এবং দুই কিশোরী বান্ধবী। এই ঘটনায় অন্তত ১৬টি পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক। উৎসবের আনন্দের মাঝেই একের পর এক পরিবারের কাছে পৌঁছেছে প্রিয়জনকে হারানোর খবর।

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত ১৯ জনের মধ্যে ১৭ জন পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা। বাকি দু’জন বিহার থেকে কলকাতায় পুজো দেখতে এসেছিলেন। শনিবার সন্ধ্যায় উত্তর ও মধ্য কলকাতায় প্রবল বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর চোরবাগান মণ্ডপে ভিড়ের চাপ আরও বেড়ে যায়। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে বহু দর্শনার্থী মণ্ডপের ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। সেই সময় ঠেলাঠেলি ও হুড়োহুড়িতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, কয়েক জন ভিড়ের চাপে মাটিতে পড়ে যান। তাঁদের উপর দিয়ে অন্য দর্শনার্থীরা এগিয়ে যাওয়ায় পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ২৫ জন। দুর্ঘটনার পর থেকেই মৃত ও আহতদের পরিচয় শনাক্ত করা এবং তাঁদের পরিবারের কাছে খবর পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

বিহার থেকে পুজো দেখতে এসে বাবা-ছেলের মৃত্যু

পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় দুর্গাপুজো দেখতে এসেছিলেন বিহারের বাসিন্দা অভিষেক শ্রীবাস্তব। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী নিভা, ছেলে আয়াংশ-সহ পরিবারের পাঁচ সদস্য। কিন্তু চোরবাগানের দুর্ঘটনায় অভিষেক ও তাঁর ছেলে আয়াংশের মৃত্যু হয়েছে। স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে কলকাতায় পুজো দেখতে এসে নিভাকে ফিরতে হল এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছেলের মৃত্যুর খবর তাঁকে জানানো হলেও স্বামীর মৃত্যুর কথা তখনও জানানো হয়নি। পরে তাঁকে বিহারের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

শাড়ি পরে ঠাকুর দেখতে এসে মৃত্যু দুই বান্ধবীর

নিউ টাউনের গৌরাঙ্গনগরের বাসিন্দা তানিয়া বিশ্বাস ও বর্ণালী হালদারের বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। দু’জনের বন্ধুত্ব ছিল অত্যন্ত গভীর। পুজোর দিন একসঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনাও ছিল তাঁদের। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী শাড়ি পরে সল্টলেক থেকে কলকাতায় পুজো দেখতে বেরিয়েছিলেন দুই কিশোরী। কিন্তু চোরবাগান মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে দু’জনেরই মৃত্যু হয়। একসঙ্গে পুজো দেখতে বেরিয়ে শেষ পর্যন্ত একসঙ্গেই প্রাণ হারাল দুই বান্ধবী।

কাজে বেরিয়ে আর ফেরা হল না নার্স শ্রীপর্ণার

হুগলির বৈদ্যবাটির বাসিন্দা শ্রীপর্ণা পোদ্দার টাটা ক্যানসার হাসপাতালের নার্স ছিলেন। শনিবার সকালে কাজে বেরিয়েছিলেন তিনি। পরে বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে যান চোরবাগানে। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। ২৭ বছরের শ্রীপর্ণা ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। মেয়েকে হারিয়ে শোকস্তব্ধ তাঁর পরিবার।

পরিবারের একমাত্র ভরসা শুভমের মৃত্যু

কলকাতার বাগমারির বাসিন্দা শুভম সোনকর বাবা, মা ও বোনের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিলেন। ৩৩ বছরের শুভম একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করতেন। পরিবারের আর্থিক দায়িত্বের বড় অংশ ছিল তাঁর কাঁধে। কিন্তু সপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগানের দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। পরিবারের উপার্জনের অন্যতম প্রধান ভরসাকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তাঁর বাবা-মা ও ভাইবোনেরা।

বন্ধুর সঙ্গে পুজো দেখতে গিয়ে মৃত্যু প্রিয়ার

উত্তর ২৪ পরগনার নিউ ব্যারাকপুরের লেনিনগড়ের বাসিন্দা প্রিয়া সমাদ্দার ছিলেন ১৯ বছরের ছাত্রী। এপিসি কলেজের কলা বিভাগের এই ছাত্রী বন্ধুদের সঙ্গে কলকাতায় পুজো দেখতে গিয়েছিলেন। চোরবাগানের দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। পেশায় দর্জি বাবা শ্যামল সমাদ্দার মেয়েকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন। যে মেয়েকে ঘিরে ছিল পরিবারের হাসি-আনন্দ, তাঁর অকালমৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না তিনি।

বাবা-মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মৃত্যু কিশোর প্রাঞ্জলের

আগরপাড়া থেকে বাবা-মায়ের সঙ্গে পুজো দেখতে এসেছিল ১৩ বছরের প্রাঞ্জল সরকার। ভিড়ের চাপে বাবা-মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সে। পরে তাকে উদ্ধার করা হলেও প্রাণে বাঁচানো যায়নি। পরিবারের সদস্যদের কাছে পৌঁছেছে তার মৃত্যুর খবর। সন্তানকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন তার মা-বাবা।

মা-ছেলে ও পরিবারের অন্য সদস্যেরও মৃত্যু

হুগলির বালিয়া গ্রামের বাপের বাড়িতে গিয়েছিলেন টগর বেজ। সঙ্গে ছিল তাঁর ১৪ বছরের ছেলে সন্দীপ বেজ। সপ্তমীতে আত্মীয়দের সঙ্গে কলকাতায় ঠাকুর দেখতে এসেছিলেন তাঁরা। পরিকল্পনা ছিল, পরের দিন বাড়ি ফিরে পুজোর গল্প করবেন পরিবারের সঙ্গে। কিন্তু চোরবাগানের দুর্ঘটনায় টগর ও সন্দীপের মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় প্রাণ হারান টগরের ভ্রাতৃবধূ পিয়ালি পরামানিকও, যাঁর বয়স ছিল ২৫ বছর। টগরের মেয়ে আগমনী বেজ দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

অন্যদিকে, বরানগরের এন কে চ্যাটার্জি রোডের বাসিন্দা দিলীপ ঘোষ ও তাঁর স্ত্রী দীপালি ঘোষও আর বাড়ি ফিরতে পারেননি। ৬২ বছরের দিলীপ এবং ৫৬ বছরের দীপালি একসঙ্গে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলেন। দুর্ঘটনার পর তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও দু’জনেরই মৃত্যু হয়।

স্ত্রীকে বাঁচাতে না পারার আক্ষেপ স্বামীর

নদিয়ার চাকদহের নতুনপাড়ার বাসিন্দা আরতি সরকার বিশ্বাস স্বামী রাম সরকারের সঙ্গে কলকাতায় পুজো দেখতে এসেছিলেন। মণ্ডপে প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে দর্শনার্থীদের বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলে হুড়োহুড়ি শুরু হয় বলে জানিয়েছেন রাম। সেই ভিড়ের চাপে মাটিতে পড়ে যান আরতি। পরে আর উঠে দাঁড়াতে পারেননি তিনি। চোখের সামনে স্ত্রীকে হারিয়ে শোকে বাক্‌রুদ্ধ রাম সরকারের আক্ষেপ, স্ত্রীকে বাঁচাতে পারেননি তিনি।

এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন শ্যামপুকুরের মিঠু মণ্ডল, বালির আকৃতি কুমারী, হাওড়ার বিকাশ ভট্টাচার্য এবং বাঁকরাহাটের স্নেহা ভাণ্ডারীও। তাঁদের পরিবারেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

প্রশ্নের মুখে পুজো মণ্ডপের নিরাপত্তা

প্রবল বৃষ্টি, অতিরিক্ত ভিড়, মণ্ডপের ভিতরে চলাচলের সমস্যা এবং বেরোনোর পথ নিয়ে ওঠা অভিযোগ—সব মিলিয়ে চোরবাগানের দুর্ঘটনা পুজোর ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সামনে এনে দিয়েছে। কীভাবে পরিস্থিতি এত দ্রুত বিপজ্জনক হয়ে উঠল, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ছিল কি না এবং দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল কি না, সেই প্রশ্নই এখন গুরুত্বপূর্ণ। যাঁরা কয়েক ঘণ্টা আগেও পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই আর বাড়ি ফিরতে পারেননি। চোরবাগানের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা শুধু ১৯টি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, একাধিক পরিবারের ভবিষ্যৎও বদলে দিয়েছে।

মৃতদের নামের তালিকা

প্রতিবেদনে উল্লেখিত মৃতদের নাম এক জায়গায় সাজিয়ে দেওয়া হল:

  1. অভিষেক শ্রীবাস্তব

  2. আয়াংশ শ্রীবাস্তব

  3. তানিয়া বিশ্বাস

  4. বর্ণালী হালদার

  5. শ্রীপর্ণা পোদ্দার

  6. শুভম সোনকর

  7. প্রিয়া সমাদ্দার

  8. প্রাঞ্জল সরকার

  9. কল্পনা জানা

  10. টগর বেজ

  11. সন্দীপ বেজ

  12. পিয়ালি পরামানিক

  13. দিলীপ ঘোষ

  14. দীপালি ঘোষ

  15. আরতি সরকার বিশ্বাস

  16. মিঠু মণ্ডল

  17. আকৃতি কুমারী

  18. বিকাশ ভট্টাচার্য