S Jaishankar warns of a possible major food crisis as wars disrupt grain shipments, fertiliser supplies and global energy markets.

Jaishankar ‘আগামী মাসেই বড় খাদ্যসংকট’, সার-জ্বালানি-শস্য নিয়ে সতর্কবার্তা জয়শঙ্করের

The NewsNest Desk : যুদ্ধ শুধু ময়দানে হয় না, তার অভিঘাত পৌঁছে যায় মানুষের খাবারের থালাতেও। ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং ইরান-উপসাগরীয় সংঘাতের জেরে আগামী কয়েক মাসে বড় খাদ্যসংকট তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে জ্বালানি সরবরাহ, সারের ঘাটতি, শস্য পরিবহণ এবং বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগের গতিপথ—এই চারটি পরস্পর জড়িত সংকটের কথা। নিউ ইয়র্কে এশিয়া সোসাইটির এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জয়শঙ্কর বলেন, এই পরিস্থিতির চাপ সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে গ্লোবাল সাউথের উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলির উপর।

জয়শঙ্করের মতে, ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং ইরান-উপসাগরীয় সংঘাত ইতিমধ্যেই উন্নয়নশীল দেশগুলির অর্থনীতির উপর বড় চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, তেলের সরবরাহের নিরাপত্তা এবং তেলকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতি এখন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে। ফলে সরবরাহের সমস্যা যেমন রয়েছে, তেমনই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে বাজারের অনিশ্চয়তাও বাড়ছে।

আর সেই জ্বালানি সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে কৃষিতে। কারণ কৃষি উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল সার। জয়শঙ্কর বলেন, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সার উৎপাদন কেন্দ্রগুলির একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ায়। যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে সেই উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়বে কৃষকদের উপর। সার কমলে উৎপাদন কমার আশঙ্কা তৈরি হবে, আর তার সঙ্গে বাড়তে পারে খাদ্যের দাম।

শুধু সার নয়, শস্য পরিবহণ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। জয়শঙ্কর উল্লেখ করেন, বিশ্বের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শস্য উৎপাদনকারী ও রফতানিকারক অঞ্চল থেকে পণ্য পরিবহণে বাধা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষ্ণসাগর দিয়ে শস্য পরিবহণের ক্ষেত্রে যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যশস্যের সরবরাহ ব্যাহত হলে আমদানিনির্ভর দেশগুলির উপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জলবায়ুর অনিশ্চয়তা। জয়শঙ্কর তাঁর বক্তব্যে ‘সুপার এল নিনো’-র কথাও উল্লেখ করেছেন। এল নিনোর কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যেতে পারে, যার প্রভাব কৃষি উৎপাদনের উপর পড়ে। ফলে একদিকে যুদ্ধের কারণে সার ও শস্যের সরবরাহে সমস্যা, অন্যদিকে প্রতিকূল আবহাওয়া—দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাব খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ‘সুপার এল নিনো’ অবশ্য কোনও আনুষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিভাগ নয়; শক্তিশালী এল নিনো বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

জয়শঙ্করের বক্তব্যে শুধু খাদ্য বা কৃষি নয়, অর্থনীতির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে—মূলধন বা বিনিয়োগ। তাঁর মতে, বড় কোনও যুদ্ধ বা ভূরাজনৈতিক সংঘাত শুরু হলে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত তুলনামূলক নিরাপদ বাজারের দিকে অর্থ সরিয়ে নেন। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলি একসঙ্গে জ্বালানি, খাদ্য, সার এবং বিনিয়োগের চাপের মুখে পড়ে।

এই পরিস্থিতিকে তিনি কার্যত একটি বহুস্তরীয় সংকট হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, জ্বালানির ঘাটতির সঙ্গে খাদ্য ও সারের সমস্যা যুক্ত হচ্ছে, তার সঙ্গে যোগ হচ্ছে অর্থের সংকট। ফলে গ্লোবাল সাউথের বহু দেশের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও সতর্কবার্তা দিয়েছেন জয়শঙ্কর। তাঁর বক্তব্য, প্রভাবশালী দেশগুলি যদি শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থের কথা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া উন্নয়নশীল বিশ্বের উপর আরও বেশি পড়বে। খাদ্য ও জ্বালানির মতো মৌলিক প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ যাতে যুদ্ধের রাজনীতির হাতিয়ার না হয়ে ওঠে, সে বিষয়ে তিনি সতর্ক করেছেন।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী। তাঁর মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের পর প্রতিবেশী দেশগুলিতে অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতার সম্পর্ক দেখা গিয়েছে। ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বর্তমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সেই চাপ আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।

তবে আগামী কয়েক মাসেই নিশ্চিত ভাবে ভয়াবহ খাদ্যসংকট হবে—এমন কোনও পূর্বাভাস জয়শঙ্কর দেননি; তিনি সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং একাধিক সংকটের সম্মিলিত প্রভাব নিয়ে সতর্ক করেছেন। ইতিমধ্যেই FAO-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অগস্টে বিশ্ব খাদ্য মূল্যসূচক ১৩৩.৩ পয়েন্টে পৌঁছেছিল, যা ২০২২ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ।

অর্থাৎ যুদ্ধের খবর শুধু সীমান্ত, ক্ষেপণাস্ত্র বা তেলের বাজারের মধ্যে আটকে নেই। তার পরের প্রশ্ন আরও সাধারণ—আগামী দিনে সাধারণ মানুষের খাবারের থালায় তার কতটা প্রভাব পড়বে? জয়শঙ্করের সতর্কবার্তা সেই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এল।