The NewsNest Desk
সৌদি আরবের সামরিক হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার দাবি করল ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। তাদের দাবি, সৌদি-ইয়েমেন সীমান্তের কাছে নাজরান অঞ্চলে অভিযান চালানোর সময় সৌদি বাহিনীর একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টারকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় তারা। অন্যদিকে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার খবর স্বীকার করলেও দাবি করেছে, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। এই ঘটনায় হেলিকপ্টারের দুই ক্রুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে সৌদি পক্ষ। ফলে হেলিকপ্টারটি হামলায় ভূপাতিত হয়েছিল, নাকি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল, তা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে তৈরি হয়েছে স্পষ্ট বিরোধ।
হামলা, না কি যান্ত্রিক ত্রুটি?
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি রবিবার এক বিবৃতিতে জানান, নাজরান অঞ্চলে একটি এএইচ-৬আই গোয়েন্দা হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, কারিগরি ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটে। এতে হেলিকপ্টারে থাকা দুই ক্রু নিহত হন। সৌদি ন্যাশনাল গার্ড মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি এলাকায় হেলিকপ্টারটি ভেঙে পড়ে বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারির দাবি, সৌদি-ইয়েমেন সীমান্তে হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে অভিযান চালানোর সময় তাঁদের বাহিনী হেলিকপ্টারটিকে ভূপাতিত করেছে। অর্থাৎ, হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা সৌদি পক্ষ স্বীকার করলেও তার কারণ নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ আলাদা। হুতিদের দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
হুতিদের দাবির জবাবে সৌদি জোটের বার্তা
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্টে হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার দাবি করেন। তার জবাবে রবিবার ভোরে তুর্কি আল-মালিকি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার সারিবদ্ধ অবস্থায় থাকা একটি ছবি প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি লেখেন, হুতিরা যে হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার দাবি করছে, সেটি শিগগিরই যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে আসবে।
আল-মালিকির এই মন্তব্যকে হুতিদের দাবির পাল্টা জবাব হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তবে প্রকাশিত ছবিটি বিধ্বস্ত হেলিকপ্টারটির বর্তমান অবস্থা বা দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিজে থেকে নিশ্চিত প্রমাণ দেয় না।
সৌদি জোটের মুখপাত্র আরও দাবি করেছেন, হুতিদের ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র দুটি সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খামিস মুশাইত শহর লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছিল বলে তাঁর বক্তব্য।
সৌদির একাধিক শহরে সতর্কতা, বাড়ছে সংঘাতের আশঙ্কা
হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনাকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেই সৌদি আরবের একাধিক অঞ্চলে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি হয়েছিল। দেশটির সিভিল ডিফেন্সের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থায় রাজধানী রিয়াদ, আবহা এবং খামিস মুশাইত শহরে সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করা হয়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে বলে জানানো হয়।
এর আগে সৌদি জোটের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রিয়াদ অঞ্চল, পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ এবং দেশের দক্ষিণাঞ্চলে চারটি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে। পাশাপাশি উত্তর ইয়েমেনের সাদা অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্র লক্ষ্য করে বিমান হামলার ভিডিও ফুটেজও প্রকাশ করে জোট। তাদের দাবি, ওই কেন্দ্রগুলি থেকে সৌদি আরবের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল।
এই ঘটনাগুলি থেকে স্পষ্ট, সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা এখনও যথেষ্ট বেশি। তবে প্রতিটি হামলার দাবি ও তার বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।
কীভাবে শুরু হয়েছিল সৌদি-হুতি সংঘাত?
ইয়েমেনে দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাতের শিকড় রয়েছে ২০১৪ সালে। ওই বছর হুতিরা রাজধানী সানা-সহ দেশের একাধিক এলাকা দখল করে নেয়। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট দেশটিতে অভিযান শুরু করে। তার পর থেকে ইয়েমেনের সংঘাত আঞ্চলিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হয়েছে।
২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির পর সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমলেও সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে উত্তেজনা পুরোপুরি শেষ হয়নি। সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা সামরিক অভিযানের দাবি নতুন করে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
ইয়েমেনের পরিস্থিতির সঙ্গে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক বিরোধও জড়িয়ে রয়েছে। হুতিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের কারণে তাদের সামরিক তৎপরতা বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে প্রতিটি সংঘর্ষকে সরাসরি বৃহত্তর যুদ্ধের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে নির্দিষ্ট ঘটনার তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
নতুন করে চাপে সৌদি আরব
নাজরান অঞ্চলে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা সৌদি আরবের সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। হুতিদের দাবি সত্য হলে তা সৌদি সামরিক বাহিনীর জন্য একটি উল্লেখযোগ্য ধাক্কা হতে পারত। অন্যদিকে, সৌদি পক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। দুই পক্ষের বক্তব্যে এই বিরোধের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ঘটনার প্রকৃত কারণ নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
তবে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাল্টাপাল্টি দাবি এবং সীমান্ত এলাকায় সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধির মধ্যে এই ঘটনা সংঘাতের ঝুঁকি আরও একবার সামনে এনেছে। আগামী দিনে সৌদি আরব কী পদক্ষেপ নেয় এবং হুতিরা নতুন করে হামলার দাবি করে কি না, সে দিকেই নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।