From Death to Political Ticket: A Dangerous Shift

From Death to Political Ticket: নাকের বদলে নরুন, আর  প্রাণের বদলে টিকিট

সৈয়দ আলি মাসুদ : ১৯৫৪ সালে ‘নাস্তিক’ ছবিতে কবি প্রদীপের লেখা একটি গান দেশজুড়ে তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল—‘দেখ তেরে সংসার কি হালাত, কিয়া হো গায়ি ভগবান! কিতনা বদল গয়া ইনসান, কিতনা বদল গয়া ইনসান…’ (সূর্য বদলায়নি, চাঁদ বদলায়নি, বদলায়নি আকাশ। কিন্তু সত্যিই কি দ্রুত বদলে যাচ্ছে মানুষ)

বিপজ্জনকভাবে বদলে যাচ্ছে মানুষের রুচি, বিবেক এবং মূল্যবোধ। সমাজের এমন অবক্ষয়ের জন্য আমরা প্রায়ই রাজনীতিকদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাই। কিন্তু তাঁরা কি ভিনগ্রহের প্রাণী? তাঁরাও তো আমাদেরই সমাজের মানুষ। কোনও পরিবার, পাড়া বা সমাজ থেকেই তাঁরা উঠে আসেন। তারপর রাজনীতির মঞ্চে উঠতে উঠতে কারও কারও শরীর থেকে খসে পড়ে লজ্জা, সম্ভ্রম, বিবেক কিংবা মূল্যবোধ। অনেকটা ব্যাঙাচির লেজ খসে গিয়ে ব্যাঙ হওয়ার মতো। লেজওয়ালা ব্যাঙ যেমন দেখা যায় না, তেমনই লজ্জা-বিবেক আঁকড়ে থাকা রাজনেতা, ওরফে রাজজীবী, আজকাল অত্যন্ত বিরল।

আর মূল্যবোধের এই ক্ষয় শুধু ব্যক্তির আচরণে থেমে থাকছে না, তার ছায়া পড়ছে রাজনীতির কৌশলেও। মানুষের আবেগ, শোক, ক্ষোভ কিংবা সহানুভূতিও কখনও কখনও হয়ে উঠছে রাজনৈতিক সম্ভাবনার উপাদান। তখন একটি মৃত্যু শুধু শোকের ঘটনা থাকে না; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পরিবার, স্মৃতি এবং জনমতের আবেগও পেয়ে যায় নতুন রাজনৈতিক অর্থ। আর সেখানেই দেখা দেয় সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন—খুন হয়ে যাওয়া মানুষের পরিবারের সদস্যকে যখন নির্বাচনের টিকিট দেওয়া হয়, তখন সেটি কি কেবল রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, সহানুভূতির প্রকাশ থাকে না , তখন সেটি শোককেও ভোটের অঙ্কে পরিণত করার এক ঘৃণ্য কৌশলে পরিণত হয়।

যে মা বাবা, স্ত্রী কিংবা নিকটাত্মীয় সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেন, তাঁকে কি প্রশ্ন করা যায় না—‘এ তুমি কেমন তুমি?’ আরও বিস্ময় তখন জাগে, যখন সেই টিকিট গ্রহণের পরেও তিনি সন্তানের হত্যার বিচার চান। তখন তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে করুণা ও রাগ—দুটিই জাগে। করুণা, কারণ শোকাহত মানুষকে রাজনীতির খেলায় টেনে আনা হয়েছে। রাগ, কারণ সেই খেলায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তটিও শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের।

তবে এই দায় কোনও একটি দলের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থাকবে। বাংলার রাজনীতিতে বহু বছর ধরেই নিহত বা মৃত নেতা-কর্মীর পরিবারের সদস্যকে নির্বাচনী রাজনীতিতে আনার নজির রয়েছে।

আরও পড়ুন : Israel ইজরাইল কি সেই মানুষগুলোকেই হত্যা করছে, যারা যুদ্ধ শেষ করতে পারত?

২০০৭ সালে রিজওয়ানুর রহমানের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই রুকবানুর রহমানকে ২০১০ সালের কলকাতা পুরসভা নির্বাচনে ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডে প্রার্থী করে তৃণমূল। ২০১১-তেও তাঁকে চাপড়া থেকে বিধানসভা ভোটে দাঁড় করানো হয়। তারও আগে, ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে নিহত তৃণমূল নেতা বিকাশ বসুর স্ত্রী মঞ্জু বসু নোয়াপাড়া থেকে প্রার্থী হয়ে বিধানসভায় পৌঁছেছিলেন। পরে ২০১১ সালেও তাঁকে প্রার্থী করা হয়।

২০১৯ সালে কৃষ্ণগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক সত্যজিৎ বিশ্বাস খুন হওয়ার পর তাঁর স্ত্রী রূপালি বিশ্বাসকে রানাঘাট লোকসভা কেন্দ্রে প্রার্থী করে তৃণমূল।

অন্য ছবিও আছে। ২০২০ সালে বিজেপি কাউন্সিলর মণীশ শুক্ল খুন হওয়ার পর ২০২১ সালে তাঁর বাবা চন্দ্রমণি শুক্লকে ব্যারাকপুর থেকে প্রার্থী করে বিজেপি। হেমতাবাদের বিজেপি বিধায়ক দেবেন্দ্রনাথ রায়ের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী চন্দিমা রায়কেও ২০২১ সালে প্রার্থী করা হয়। ২০২২-এর বগটুই হত্যাকাণ্ডের পর নিহত পরিবারের সদস্য সিমা বিবি ও মারিনা বিবি ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী হন।

এখানেই শেষ নয়। ২০২৫ সালের কালীগঞ্জ উপনির্বাচনের পর বোমা বিস্ফোরণে ন’বছরের তামান্না শেখের মৃত্যু হয়। মেয়ের মৃত্যুর পর বিচার চেয়ে সামনে আসেন তাঁর মা সাবিনা ইয়াসমিন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সিপিআই(এম) তাঁকেই কালীগঞ্জ থেকে প্রার্থী করে। অর্থাৎ তৃণমূল-বিজেপির বাইরে বাম রাজনীতিতেও এমন নজির রয়েছে।

বাংলার বাইরে ছবিটিও খুব আলাদা নয়। ছত্তীসগঢ়ে কংগ্রেস নেতা মহেন্দ্র কর্ম ২০১৩ সালের মাওবাদী হামলায় নিহত হওয়ার পর তাঁর স্ত্রী দেবতী কর্ম রাজনীতিতে আসেন। ২০১৯ সালের দান্তেওয়াড়া উপনির্বাচনে কংগ্রেস তাঁকে প্রার্থী করে। একই নির্বাচনে বিজেপি নিহত বিধায়ক ভীমা মাণ্ডভির স্ত্রী ওজস্বী মাণ্ডভিকে প্রার্থী করেছিল।

কারও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, কোথাও সহানুভূতি, কোথাও ন্যায়বিচারের দাবিকে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে পরিণত করার চেষ্টা। কিন্তু ঘটনাগুলিকে পাশাপাশি রাখলে প্রশ্ন উঠবেই, হত্যা ও মৃত্যুকে কি এইভাবে নির্বাচনী সম্পদে পরিণত করা যায় ? প্রচলিত বাংলায় শুনেছি—‘নাকের বদলে নরুন’। এখন দেখছি প্রাণের বদলে টিকিট’।

মানুষের স্মৃতি চিরকালই দুর্বল ছিল। কিন্তু রিলের দুনিয়া বিস্মৃতিকে দিয়েছে অভাবনীয় গতি। আজ যে মৃত্যু আমাদের চোখে জল আনে, কাল সেটিই পুরনো ভিডিও। আজ যে মায়ের কান্না আমাদের ক্ষুব্ধ করে, কাল নতুন কোনও রিল এসে তাকে স্ক্রলের নিচে ঠেলে দেয়। নতুন মুখ, নতুন স্লোগান, নতুন বিতর্ক—পুরনো শোক দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যায়।

মিলান কুন্দেরা ছিলেন চেক বংশোদ্ভূত বিশ্বখ্যাত ঔপন্যাসিক ও চিন্তক। তাঁর লেখায় বারবার ফিরে এসেছে স্মৃতি, বিস্মৃতি, ক্ষমতা এবং মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্ন। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস দ্য বুক অব লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং-এ তিনি লিখেছিলেন, “The struggle of man against power is the struggle of memory against forgetting.” অর্থাৎ, ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই আসলে স্মৃতিকে বিস্মৃতির হাত থেকে বাঁচানোর লড়াই।

কুন্দেরার এই কথাটাই যেন আমাদের সামনে অন্য একটি প্রশ্ন তুলে ধরে। যে হত্যাকাণ্ডে সঠিক তদন্ত, সত্য উদ্ঘাটন এবং ন্যায়বিচারের দাবি সবচেয়ে জোরালো হওয়ার কথা, সেখানে সেই মৃত্যুর স্মৃতিকে যদি রাজনৈতিক প্রতীক, প্রচার আর নির্বাচনী আবেগের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়, তাহলে মূল প্রশ্নটাই কি ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায় না? মানুষটি কীভাবে মারা গেলেন, কেন মারা গেলেন এবং তাঁর মৃত্যুর জন্য দায়ী কে—এই প্রশ্নগুলির জায়গা দখল করে নেয়, কে প্রার্থী হলেন, কোন দলের প্রতীকে লড়লেন এবং কত ভোট পেলেন।

আর এখানেই আরও একটি বিপদ তৈরি হয়। যে মানুষটি একদিন নিজের প্রিয়জনের মৃত্যুর বিচার চেয়ে মানুষের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনিই যখন সেই দলের প্রার্থী হয়ে যান, তখন তাঁর অবস্থানও বদলে যায়। তিনি আর শুধু শোকাহত পরিবারের সদস্য থাকেন না; তিনি হয়ে ওঠেন একটি দলের প্রার্থী, একটি প্রতীকের প্রতিনিধি, একটি রাজনৈতিক সংগঠনের অংশ। আবেগ তাঁকে নির্বাচনে জেতাতে পারে, কিন্তু জয়ের পর সেই আবেগের জায়গা নেয় দলীয় দায়িত্ব ও রাজনৈতিক আনুগত্য।

আরও পড়ুন : Etiquette: বাড়ছে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের বহর, কমছে সহবত

তখন দলের অবস্থানের সঙ্গে নিজের ন্যায়বিচারের দাবির সংঘাত হলে প্রশ্ন তোলাও কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যায় না করেও অন্যায়কে সহ্য করে নেওয়াকে রাজনৈতিক কর্তব্য বলে মনে হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। কারণ যে রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে, সেই কাঠামোর বাইরে বেরিয়ে যাওয়াটাই তখন তাঁর জন্য সবচেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ, যে মৃত্যু তাঁকে রাজনীতির ময়দানে এনেছিল, শেষ পর্যন্ত সেই মৃত্যুর বিচার চাওয়ার স্বাধীনতাই হয়তো সংকুচিত হয়ে যায়।

এটাই গণতন্ত্রের জন্য আরও বড় আশঙ্কা। গণতন্ত্র শুধু ভোটে জেতা বা ক্ষমতায় আসার নাম নয়। গণতন্ত্রের প্রাণ হল প্রশ্ন করার অধিকার, সত্য জানার অধিকার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর স্বাধীনতা। কোনও মৃত্যুর স্মৃতিকে যদি ন্যায়বিচারের দাবির বদলে রাজনৈতিক আনুগত্যের পুঁজি করে তোলা হয়, তাহলে হারিয়ে যায় শুধু একটি পরিবারের শোক নয়—দুর্বল হয়ে পড়ে গণতন্ত্রের সেই প্রশ্ন করার জায়গাটিও।

তাই প্রশ্নটা শেষ পর্যন্ত শুধু এই নয়—কেন কেউ টিকিট নিলেন? প্রশ্নটা আরও গভীর। আমরা কি তাঁর শোককে সম্মান করেছি, নাকি তাঁর শোককে ব্যবহার করেছি? আমরা কি বিচার চাওয়ার কণ্ঠকে শক্তিশালী করেছি, নাকি সেই কণ্ঠকেই একটি দলের প্রতীকের নিচে চাপা দিয়েছি?

রিলের এই দ্রুত বদলে যাওয়া সময়ে তাই স্মৃতিকে আঁকড়ে থাকাই হয়তো সবচেয়ে জরুরি। কারণ মৃত্যু যদি শুধু পরের নির্বাচনের পোস্টার হয়ে যায়, আর বিচার যদি হারিয়ে যায় নতুন স্লোগানের ভিড়ে, তাহলে আমরা শুধু একজন মৃত মানুষকে ভুলে যাই না—ভুলে যাই কেন তাঁর মৃত্যুর বিচার চাওয়া হয়েছিল।

‘নাকের বদলে নরুন’ এর মতো ‘প্রাণের বদলে টিকিট’ যদি একদিন রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্বীকৃত নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে খুনও হয়তো ধীরে ধীরে রাজনৈতিক টিকিটের মাধ্যমে কোথাও না কোথাও বৈধতার আবরণ পেয়ে যাবে। আর একটি গণতান্ত্রিক দেশে তার থেকে আর বিপজ্জনক জিনিস আর কি হতে পারে।