Dhanteras 2026: Explore the ancient Hindu traditions, mythology and spiritual significance of Dhantrayodashi

Dhanteras শুধু সোনা-রুপো কেনা নয়, ধনতেরাসের পিছনে রয়েছে গভীর পৌরাণিক তাৎপর্য! জানুন ইতিহাস ও বিশ্বাস

The NewsNest Desk : আলোর উৎসব দীপাবলির সূচনা হয় ধনতেরাসের হাত ধরে। হিন্দু সংস্কৃতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই উৎসব শুধুমাত্র সোনা, রুপো কিংবা নতুন বাসন কেনার দিন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সম্পদ, সুস্বাস্থ্য, সমৃদ্ধি, দীর্ঘায়ু এবং শুভ সূচনার গভীর ধর্মীয় বিশ্বাস। প্রতি বছর কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে পালিত হয় ধনতেরাস, যা ধনত্রয়োদশী নামেও পরিচিত। ২০২৬ সালে ৬ নভেম্বর শুক্রবার পালিত হচ্ছে ধনতেরাস।

‘ধনতেরাস’ শব্দটি এসেছে ‘ধন’ এবং ‘তেরস’ থেকে। ধন অর্থ সম্পদ এবং তেরস অর্থ ত্রয়োদশী তিথি। এই দিনটিকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা নতুন কিছু কেনা, ঘর পরিষ্কার করা, প্রদীপ জ্বালানো এবং দেবদেবীর আরাধনার মাধ্যমে উদযাপন করেন। তবে এই উৎসবের প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে প্রাচীন পৌরাণিক কাহিনির দিকে।

সমুদ্র মন্থন ও ভগবান ধন্বন্তরির আবির্ভাব

ধনতেরাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হিন্দু পুরাণের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা সমুদ্র মন্থন। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, অমৃত লাভের উদ্দেশ্যে দেবতা ও অসুররা ক্ষীরসাগর মন্থন করেছিলেন। সেই মন্থন থেকে একে একে উঠে এসেছিল বহু মূল্যবান বস্তু ও দেবদেবী। আবির্ভূত হয়েছিলেন দেবী লক্ষ্মীও।

এই সমুদ্র মন্থনের পর্বেই আবির্ভূত হন ভগবান ধন্বন্তরি। তাঁর হাতে ছিল অমৃতের কলস। হিন্দু ধর্মে ধন্বন্তরিকে চিকিৎসা, সুস্বাস্থ্য এবং আয়ুর্বেদের দেবতা হিসেবে মান্য করা হয়। সেই কারণে ধনতেরাসের দিন ধন্বন্তরির পূজা বিশেষ গুরুত্ব পায়। এই উৎসবের সঙ্গে স্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ুর প্রার্থনাও যুক্ত হয়ে যায়।

ধনতেরাসের এই পৌরাণিক যোগসূত্র থেকেই বোঝা যায়, উৎসবটি কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতীক নয়, বরং সুস্থ ও সুন্দর জীবনের কামনাও বহন করে।

কেন ধনতেরাসে সোনা-রুপো কেনা শুভ?

ধনতেরাসে সোনা, রুপো কিংবা নতুন ধাতব বাসন কেনার রীতি বহু প্রাচীন। প্রচলিত বিশ্বাস, এই দিনে নতুন ধাতব সামগ্রী বাড়িতে আনলে সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির আগমন ঘটে। দেবী লক্ষ্মীর আশীর্বাদ লাভের আশায় বহু পরিবার এই দিনে সোনার গয়না, রুপোর মুদ্রা কিংবা বাসন কেনেন।

তবে সোনা কেনার মধ্যেই এই উৎসবের তাৎপর্য সীমাবদ্ধ নয়। অনেক পরিবার সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট বাসন, ধাতব পাত্র কিংবা প্রয়োজনীয় কোনও সামগ্রী কেনেন। মূল বিশ্বাস হল, শুভ দিনে নতুন কিছু ঘরে আনা আগামী দিনের সমৃদ্ধির প্রতীক।

বর্তমানে ধনতেরাসকে কেন্দ্র করে সোনার বাজার, রুপোর বাজার এবং বিভিন্ন বিপণিতে বিশেষ কেনাকাটার প্রবণতা দেখা যায়। তবে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি আর্থিক সামর্থ্য ও প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে কেনাকাটা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

দেবী লক্ষ্মী ও কুবেরের আরাধনা

ধনতেরাসে দেবী লক্ষ্মীর পাশাপাশি ধনসম্পদের অধিপতি কুবেরের পূজাও প্রচলিত। হিন্দু ধর্মে দেবী লক্ষ্মীকে সৌভাগ্য, সম্পদ ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে মানা হয়। অন্যদিকে, কুবেরকে ধনসম্পদের রক্ষক হিসেবে পূজা করা হয়।

এই দিনে বহু পরিবার বাড়িঘর পরিষ্কার করে সাজিয়ে তোলে। সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালানো হয়। অনেক বাড়িতে লক্ষ্মী-কুবেরের পূজা করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, পরিচ্ছন্ন ও আলোকিত গৃহে শুভ শক্তির আগমন ঘটে।

ধনতেরাসের এই আচার-অনুষ্ঠান মানুষের জীবনে শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা এবং ইতিবাচকতার বার্তাও বহন করে।

যমদীপদানের প্রথা ও রাজা হিমার কাহিনি

ধনতেরাসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য রীতি হল যমদীপদান। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, রাজা হিমার পুত্রের বিবাহের চতুর্থ দিনে সাপের কামড়ে মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁর নববিবাহিতা স্ত্রী স্বামীকে রক্ষা করার জন্য ঘরের দরজায় সোনা-রুপোর অলঙ্কার ও প্রদীপ সাজিয়ে রাখেন। সারারাত গান ও গল্পের মাধ্যমে স্বামীকে জাগিয়ে রাখেন।

কথিত আছে, মৃত্যুর দেবতা যম সাপের রূপে সেখানে উপস্থিত হলেও প্রদীপের আলো ও অলঙ্কারের ঝলকে বিভ্রান্ত হয়ে ফিরে যান। ফলে রাজপুত্রের প্রাণ রক্ষা পায়।

এই কাহিনির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ধনতেরাসের সন্ধ্যায় যমের উদ্দেশ্যে প্রদীপ জ্বালানোর প্রথা প্রচলিত হয়েছে। অনেক পরিবারে বাড়ির বাইরে প্রদীপ জ্বালিয়ে পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘায়ু ও অকালমৃত্যুর ভয় থেকে মুক্তির প্রার্থনা করা হয়।

ধনতেরাসের প্রকৃত শিক্ষা কী?

বর্তমান সময়ে ধনতেরাস অনেকের কাছে কেনাকাটার উৎসব হয়ে উঠলেও এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা আরও গভীর। সম্পদ, স্বাস্থ্য, পারিবারিক সুখ এবং মানসিক শান্তি—সবকিছুর সমন্বয়েই একটি সুন্দর জীবন গড়ে ওঠে।

ধনতেরাস মনে করিয়ে দেয়, অর্থসম্পদ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও সুস্বাস্থ্য, পরিবারের ভালোবাসা এবং মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্কই প্রকৃত সমৃদ্ধির ভিত্তি। তাই এই শুভ দিনে শুধু নতুন সামগ্রী কেনা নয়, বরং ঘর পরিষ্কার রাখা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং আগামী দিনের জন্য ইতিবাচক সংকল্প গ্রহণ করাও উৎসবের সুন্দর অংশ হতে পারে।

সব মিলিয়ে, ধনতেরাস হিন্দু সংস্কৃতির এমন এক উৎসব, যেখানে পৌরাণিক বিশ্বাস, ধর্মীয় আচার এবং পারিবারিক আনন্দ একসূত্রে মিশে গিয়েছে। সোনা-রুপোর ঝলক কিংবা প্রদীপের আলো—সবকিছুর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে সুখ, শান্তি, সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধ জীবনের প্রত্যাশা।