Nepal faces kidney crisis from organ trafficking and extreme heat

Nepal ‘কিডনি আবার গজাবে’ বলে প্রতারণা, নেপালের ‘কিডনি ভ্যালি’তে নতুন বিপদ প্রবাসী শ্রমিকদের

The NewsNest Desk : দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে একসময় কিডনি বিক্রির ফাঁদে ফেলা হয়েছিল নেপালের হকসে গ্রামের বহু মানুষকে। সেই কারণেই পাহাড়ি এই গ্রামটি পরিচিত হয়ে উঠেছে ‘কিডনি ভ্যালি’ নামে। কিন্তু কিডনি পাচারের সেই ভয়াবহ অধ্যায় পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই নেপালে সামনে এসেছে আরেক উদ্বেগজনক বাস্তবতা। উপসাগরীয় দেশ ও মালয়েশিয়ায় প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় কাজ করতে গিয়ে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত করে দেশে ফিরছেন বহু তরুণ শ্রমিক।

২০২৬ সালের মে মাসে নেপালের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব লেবার অ্যান্ড মোবিলিটি (সিইএসএলএএম) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে কিডনি পাচার এবং অভিবাসী শ্রমিকদের কিডনি-সংক্রান্ত অসুস্থতার এই দুই সংকটের চিত্র উঠে এসেছে।

দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে কিডনি বিক্রির ফাঁদ

হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত হকসে গ্রামের বাসিন্দা কাঞ্চা ও রাম অর্থের চাপে নিজেদের একটি করে কিডনি বিক্রি করেছিলেন। অস্ত্রোপচারের চিহ্ন এখনও তাঁদের শরীরে রয়েছে। কাঞ্চার দাবি, অপারেশনের পরও তিনি নিয়মিত ব্যথায় ভোগেন এবং আগের মতো কাজ করতে পারেন না।

তাঁর কথায়, শুধু হকসে নয়, আশপাশের এলাকাতেও কত মানুষ কিডনি বিক্রি করেছেন, তার সঠিক হিসাব করাই কঠিন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে দালালরা অর্থের টোপ দেখিয়ে দরিদ্র মানুষকে কিডনি বিক্রিতে রাজি করিয়েছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে এমন কথাও বলা হয়েছিল যে, শরীর থেকে একটি কিডনি বের করে নিলেও পরে সেটি আবার তৈরি হয়ে যাবে। এই ধরনের মিথ্যা আশ্বাসে অনেকে অস্ত্রোপচারে রাজি হন। পরে গুরুতর শারীরিক সমস্যায় পড়ার পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

বিদেশের গরমে নষ্ট হচ্ছে তরুণদের কিডনি

অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির আশায় নেপাল থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমিক উপসাগরীয় দেশ এবং মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান। কিন্তু সেখানে তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ কাজ, পর্যাপ্ত পানি না পাওয়া এবং বিশ্রামের অভাব তাঁদের শরীরে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।

২৯ বছরের জিত বাহাদুর গুরুং সৌদি আরবে প্রায় তিন বছর কাজ করেছিলেন। প্রায় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কাজ করার সময় পর্যাপ্ত পানি পান বা বিশ্রামের সুযোগ খুব কম ছিল বলে তিনি জানান। একসময় তাঁর পা ফুলতে শুরু করে এবং হাঁটাচলাতেও সমস্যা দেখা দেয়। চিকিৎসা পরীক্ষার পর জানা যায়, তাঁর কিডনি বিকল হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে সপ্তাহে তিন দিন ডায়ালাইসিস নিতে হচ্ছে তাঁকে।

দুবাইয়ে সাত বছর কাজ করা ৩৪ বছরের ইশ্বরের অভিজ্ঞতাও একই রকম। প্রতিদিন প্রায় ১৬ ঘণ্টা প্রচণ্ড গরমের মধ্যে কাজ করার পর তাঁর শরীরে ফোলা দেখা দেয়। বর্তমানে কিডনি প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।

নেপালের মানব অঙ্গ প্রতিস্থাপন কেন্দ্রের চিকিৎসক পুকার শ্রেষ্ঠ জানান, আগে সাধারণত বয়স্ক রোগীদের কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য হাসপাতালে আসতে দেখা যেত। এখন তুলনামূলক কম বয়সি রোগীদেরও সংকুচিত ও ক্ষতিগ্রস্ত কিডনি নিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে।

তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সঙ্গে বিদেশফেরত শ্রমিকরা যুক্ত, যদিও নেপালের মোট জনসংখ্যার মাত্র প্রায় ১৪ শতাংশ এই শ্রমিকদের অংশ।

ভারত হয়ে কিডনি পাচারের অভিযোগ

নেপাল-ভারত সীমান্ত ব্যবহার করে কিডনি পাচারের অভিযোগও নতুন করে সামনে এসেছে। সিইএসএলএএমের প্রতিবেদনে এমনই এক ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

সিন্ধুলির ওই ব্যক্তিকে ভারতে হোটেলে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল একটি চক্র। পরে চণ্ডীগড়ে তাঁকে প্রায় এক মাস আটকে রাখা হয়। রক্ত, প্রস্রাব ও এক্স-রে পরীক্ষার কথা বলে তাঁকে একটি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ।

সেখানেই তাঁকে জানানো হয়, তাঁর একটি কিডনি অস্ত্রোপচার করে বের করা হবে এবং বিনিময়ে দেওয়া হবে ৬ লাখ রুপি। তিনি রাজি না হওয়ায় তাঁকে জোর করে অচেতন করে বাম কিডনি অপসারণ করা হয় বলে অভিযোগ করেন ওই ব্যক্তি। পরে মাত্র ১০ হাজার রুপি দিয়ে তাঁকে নেপালে ফেরত পাঠানো হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নেপালের মানবপাচার তদন্ত ব্যুরোর এসএসপি কৃষ্ণ পাঙ্গেনির বক্তব্য, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষকে বিদেশে চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণার ফাঁদে ফেলার ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। অনেক ভুক্তভোগী শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার পর অথবা প্রতিশ্রুত অর্থ না পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার দ্বারস্থ হন।

চিকিৎসকদের মতে, বিদেশে যাওয়ার আগে শ্রমিকদের প্রচণ্ড গরমে পর্যাপ্ত পানি পান, নির্দিষ্ট সময় অন্তর বিশ্রাম এবং স্বাস্থ্যকর খাবারের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। ফলে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত গরমের সঙ্গে যুক্ত কিডনি-সংক্রান্ত স্বাস্থ্যঝুঁকিও আরও বড় আকার নিতে পারে।