The NewsNest Desk : পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদলের ছাপ এ বার দুর্গাপুজোর মণ্ডপেও। সল্টলেকের বিজে ব্লক ও বিএইচ ব্লকের পুজোকে ঘিরে এ বার বিশেষভাবে নজরে রয়েছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। দীর্ঘদিন ধরে বিজে ব্লকের পুজোয় সময় কাটালেও এ বার দুই পাড়ার পুজোতেই দেখা যাচ্ছে তাঁকে। আর তাঁকে ঘিরেই বিজে ব্লকের পুজোমণ্ডপে নিরাপত্তার কড়াকড়ি নজর কেড়েছে দর্শনার্থীদের।
বিধাননগরের বিএইচ ব্লকের বাসিন্দা শমীক। এত দিন পুজোর দিনগুলিতে তাঁর পরিচিত আড্ডার জায়গা ছিল পাশের বিজে ব্লক। সেখানে দীর্ঘদিনের বন্ধু ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের সঙ্গে সময় কাটাতেন তিনি। তবে এ বার পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। দুই ব্লকের পুজো কমিটির সঙ্গেই তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। ফলে কোনও পুজো কমিটির আনুষ্ঠানিক দায়িত্বে না থেকেও দুই মণ্ডপেই তাঁকে ঘিরে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
বিজে ব্লকে কড়া নিরাপত্তা, নজরদারিতে প্রবেশপথ
এ বারের বিজে ব্লকের পুজোমণ্ডপ তৈরি হয়েছে গুজরাতের সোমনাথ মন্দিরের আদলে। আলোর সাজে সন্ধ্যার পর মণ্ডপের চেহারা আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। কিন্তু মণ্ডপের সৌন্দর্যের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের নজর কাড়ছে নিরাপত্তার ব্যবস্থা।
পার্কের বিভিন্ন প্রবেশপথে বসানো হয়েছে ডোরফ্রেম মেটাল ডিটেক্টর। প্রবেশপথের আকার অনুযায়ী কোথাও একটি, কোথাও একাধিক যন্ত্র রাখা হয়েছে। শুধু প্রবেশপথেই নয়, মেটাল ডিটেক্টরের ভিতরে ও বাইরেও পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। সাদা পোশাকের পুলিশ, খাকি উর্দিধারী কর্মী এবং অন্যান্য নিরাপত্তাকর্মীদেরও বিভিন্ন জায়গায় নজরদারি চালাতে দেখা যাচ্ছে।
মণ্ডপের পাশাপাশি পার্কের মেলা চত্বর ও সামনের রাস্তাতেও রয়েছে পুলিশি নজরদারি। তবে এই নিরাপত্তার মধ্যেও সাধারণ দর্শনার্থীদের যাতায়াত যাতে অকারণে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার চেষ্টা করছে পুলিশ।
শমীক ভট্টাচার্যকে ঘিরে নিরাপত্তার এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলেও আলোচনা চলছে। যদিও নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়ে পুলিশের তরফে আলাদা করে কোনও নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
মঞ্চে ওঠা নিয়েও আপত্তি শমীকের
বিজে ব্লকের পুজোয় এ বার শুধু দর্শনার্থী হিসেবে নয়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চেও দেখা গিয়েছে শমীককে। পুজো কমিটির কর্তাদের অনুরোধে তৃতীয়ার সন্ধ্যায় মঞ্চে ওঠেন তিনি। তবে সেখানে উপস্থিত হওয়া নিয়ে যে তিনি খুব একটা স্বচ্ছন্দ ছিলেন না, তা তাঁর বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়েছে।
শমীকের বক্তব্য, পুজোর সময়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়াই তাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যাস। কোনও পুজো কমিটির পদে তিনি কখনও ছিলেন না। এ বার তাঁকে মঞ্চে তুলে রাজনৈতিক পরিচিতিকে সামনে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেই তাঁর আপত্তি।
তাঁর কথায়, এই ধরনের আয়োজন তাঁকে দীর্ঘদিনের বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা। অর্থাৎ, পাড়ার পরিচিত মানুষ হিসেবে পুজোয় সময় কাটানোর যে অভ্যাস ছিল, রাজনৈতিক পদমর্যাদার কারণে তা বদলে যাক, এমনটা তিনি চান না।
বিএইচ ব্লকের পুজোতেও বাড়তি আয়োজন
শমীকের নিজের পাড়া বিএইচ ব্লকের পুজোও এ বার বিশেষভাবে আলোচনায়। বিজে ব্লকের তুলনায় আয়োজন ছোট হলেও এই পুজোর সঙ্গে তাঁর পারিবারিক ও দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্ক রয়েছে। ব্লকের পুজো কমিটির সভাপতি মৈনাক দত্তের পরিবারের সঙ্গে শমীকের পরিবারের পরিচয় কয়েক দশকের।
মৈনাকের বক্তব্য অনুযায়ী, দুই পরিবারের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। আগে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পুজো কমিটিতে শমীককে সামনে আনা সম্ভব হত না। এ বার সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে বলেই তাঁর দাবি।
বিএইচ ব্লকের পুজোমণ্ডপে এ বার শিল্পভাবনার বিশেষ ছাপ রয়েছে। গামছা, বেত ও লালপেড়ে সাদা শাড়ি দিয়ে সাজানো হয়েছে মণ্ডপ। পাশাপাশি যামিনী রায়ের চিত্রশৈলীর আদলে বিভিন্ন পটচিত্রও ব্যবহার করা হয়েছে। ব্লকের প্রবীণ বাসিন্দাদের কথা মাথায় রেখে মণ্ডপে বসে আড্ডা দেওয়ার মতো খোলামেলা জায়গা রাখা হয়েছে।
পুজো কমিটির সদস্যদের দাবি, বিএইচ ব্লকে প্রায় ১৮০টি প্লট রয়েছে। ছোট ব্লক হওয়ায় সাধারণত বড় আকারের আয়োজন করা হয় না। তবে এ বার মণ্ডপের পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি ভোগ ও খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাও কিছুটা সম্প্রসারিত হয়েছে।
পাড়ার পুজো, না কি রাজনৈতিক গুরুত্বের নতুন ছবি?
বিজে ও বিএইচ—দুই ব্লকের পুজোতেই শমীকের উপস্থিতি এ বার আলাদা মাত্রা পেয়েছে। এক দিকে রয়েছে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও পাড়ার সম্পর্ক, অন্য দিকে রয়েছে রাজ্য বিজেপির সভাপতির রাজনৈতিক পরিচয়। এই দুইয়ের টানাপোড়েনই এ বারের পুজোকে ঘিরে আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে।
শমীক নিজে পাড়ার পুজোয় স্বাভাবিকভাবে সময় কাটাতে চান বলেই জানিয়েছেন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান এবং বর্তমান পরিস্থিতির কারণে তাঁকে ঘিরে আগ্রহ ও নিরাপত্তার আয়োজন—দুটিই বেড়েছে। ফলে সল্টলেকের এই দুই পুজো এ বার শুধু উৎসবের আয়োজন নয়, রাজ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক সমীকরণের একটি আলোচিত ছবিও তুলে ধরছে।