The NewsNest Desk: জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালায়। রেকর্ড গরমের একটি গ্রীষ্মের পর দ্রুত গলছে দেশটির হিমবাহগুলি। নতুন গবেষণা বলছে, মাত্র পাঁচ বছরে সুইজারল্যান্ডের হিমবাহগুলির প্রায় ২০ শতাংশ বরফের ভর হারিয়ে গিয়েছে। ২০২৬ সালেও গলনের হার ছিল রেকর্ডের দিক থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, পরিস্থিতি ‘বিপর্যয়কর’।
সুইজারল্যান্ডের হিমবাহ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা গ্লেসিয়ার মনিটরিং ইন সুইজারল্যান্ড বা GLAMOS-এর সাম্প্রতিক পরিমাপ অনুযায়ী, চলতি বছর দেশটির হিমবাহগুলির মোট বরফের পরিমাণের প্রায় ৫.৫ শতাংশ গলে গিয়েছে। এর আগে শীতকালে তুষারপাত ছিল তুলনামূলকভাবে কম। তার পর জুন, জুলাই ও আগস্ট—টানা তিন মাসেই সুইজারল্যান্ডে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড তৈরি হয়। GLAMOS-এর প্রধান এবং হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ম্যাথিয়াস হুস ২০২৬ সালকে ‘বিপর্যয়কর বছর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। প্রায় ৩ হাজার মিটার উচ্চতায় অবস্থিত সেক্স রুজ হিমবাহ পরিদর্শনের সময় তিনি জানান, এই হিমবাহ দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার অবস্থায় নেই। তাঁর আশঙ্কা, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে সেখানে আর বরফ নাও থাকতে পারে।
হিমবাহের বরফ গলার মাত্রা বোঝার জন্য ব্যবহার করা হয় বিশেষ মাপের দণ্ড। সেক্স রুজ হিমবাহে প্রায় ৪ মিটার লম্বা অ্যালুমিনিয়ামের একটি দণ্ড বসানো হয়েছিল। জুলাইয়ের শেষ দিকে সেটি বরফের মধ্যে প্রায় সম্পূর্ণ ঢেকে ছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে দেখা যায়, বরফ গলে যাওয়ায় দণ্ডটির তিন মিটারেরও বেশি অংশ বাইরে বেরিয়ে এসেছে। GLAMOS-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে সুইজারল্যান্ডের হিমবাহগুলির বরফ গলার গতি আগের যে কোনও পাঁচ বছরের পর্যায়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২১ সালের পর থেকে দেশটির হিমবাহগুলির মোট বরফের পরিমাণ প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। দীর্ঘমেয়াদি হিসাবও উদ্বেগজনক। ১৯৯০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে সুইজারল্যান্ডের হিমবাহের প্রায় ১০ শতাংশ বরফ হারিয়েছিল। সেখানে গত ১০ বছরেই ক্ষয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ।
এবার গ্রীষ্মে অনেক হিমবাহের ওপর থাকা সুরক্ষামূলক তুষারের স্তর জুনের তাপপ্রবাহের সময়ই পাতলা হয়ে যেতে শুরু করে। সেপ্টেম্বরের মধ্যে উচ্চ পার্বত্য এলাকাতেও সেই তুষারস্তর প্রায় সম্পূর্ণ উধাও হয়ে যায়। ফলে সরাসরি সূর্যের তাপ বরফের ওপর পড়ায় গলনের গতি আরও বেড়ে যায়।কিছু হিমবাহে বরফের গড় পুরুত্ব কমেছে ২.৫ থেকে ৪ মিটার পর্যন্ত। অপেক্ষাকৃত নিচু ও বেশি উন্মুক্ত অংশগুলিতে ক্ষতি আরও ভয়াবহ। সেখানে গ্রীষ্মকালজুড়ে বরফের পুরুত্ব প্রায় ১০ মিটার পর্যন্ত কমেছে। অতিরিক্ত গলনের কারণে গবেষকদের কয়েকটি জায়গায় বরফের পরিমাপের দণ্ডও নতুন করে আরও উঁচু এলাকায় বসাতে হয়েছে।
তবে ২০২৬ সালের গলন ২০২২ সালের সর্বোচ্চ রেকর্ডকে ছাপিয়ে যায়নি। এর একটি কারণ, চলতি বছরের গ্রীষ্মের আগে কয়েকটি হিমবাহে তুলনামূলক বেশি তুষার জমেছিল। পাশাপাশি সাহারা মরুভূমি থেকে আসা ধুলোর পরিমাণও কম ছিল। ফলে বরফ বেশি সূর্যালোক প্রতিফলিত করতে পেরেছে।তার পরও চারটি গুরুত্বপূর্ণ হিমবাহে এ বছর সর্বকালীন সর্বোচ্চ গলনের রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সুইজারল্যান্ডের অন্যতম পরিচিত রোন হিমবাহ এবং আল্পসের বৃহত্তম আলেচ হিমবাহ।
শুধু প্রকৃতি বা পাহাড়ের সৌন্দর্য নয়, হিমবাহ গলে যাওয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে জলসম্পদের ভবিষ্যৎ। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সুইজারল্যান্ডের হিমবাহগুলি প্রায় ২.২ ট্রিলিয়ন লিটার জল হারিয়েছে বলে জানিয়েছে GLAMOS। বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমবাহের দ্রুত সংকোচন অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আল্পস অঞ্চলের জল সরবরাহ এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা তাই স্পষ্ট—আল্পসের হিমবাহগুলি যে গতিতে গলছে, তাতে বর্তমান উষ্ণতার পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বহু হিমবাহের অস্তিত্বই আগামী কয়েক দশকে প্রশ্নের মুখে পড়বে।