The NewsNest Desk : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-কে নৈতিকতার পাঠ দিতে ধর্মীয় দর্শনের সাহায্য নিচ্ছে প্রযুক্তি সংস্থাগুলি। সেই উদ্যোগেই উঠে এসেছে কলকাতায় জন্ম নেওয়া হিন্দু সন্ন্যাসী স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দের নাম। আমেরিকার এআই সংস্থা অ্যানথ্রপিকের সদর দফতরে গিয়ে এআই-এর নৈতিকতা নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন তিনি। কিন্তু যন্ত্রকে নীতিবান করে তোলার এই চেষ্টার মধ্যেই উঠছে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এআই-এর নৈতিকতা নিয়ে আলোচনার আগে মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষায় কি বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়?
১৭ অক্টোবর, দুর্গাপুজোর আবহে নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কোয়ারে বক্তব্য ও আশীর্বাদ দেওয়ার কথা স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দের। ৫৫ বছর বয়সি এই সন্ন্যাসী রামকৃষ্ণ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত এবং নিউ ইয়র্কের বেদান্ত সোসাইটির প্রধান। এআই-এর দ্রুত পরিবর্তনশীল দুনিয়ায় মানুষের জীবনের অর্থ, সুখ এবং আত্মিক উপলব্ধি নিয়ে তাঁর বক্তব্য এখন প্রযুক্তি মহলেও আগ্রহ তৈরি করছে।
এআই-এর নৈতিকতা নিয়ে কেন আগ্রহী অ্যানথ্রপিক?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণাকারী সংস্থা অ্যানথ্রপিকের তৈরি এআই সহকারী ক্লদ (Claude)। চলতি বছরের গোড়ায় সংস্থাটি স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দকে এআই-এর নৈতিকতা নিয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। সান ফ্রান্সিসকোয় সংস্থার সদর দফতরে গিয়ে গবেষকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সেখানে তাঁকে কয়েকটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পও দেখানো হয়।
১৩ জুন উত্তর টেক্সাসে বেদান্ত দর্শনে সুখের ধারণা নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দ ক্লদের প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর কথায়, সংস্থার গবেষকেরা তাঁকে ক্লদের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি সম্পর্কে জানিয়েছিলেন। মিথোস (Mythos) এবং প্রজেক্ট গ্লাসউইং (Project Glasswing) নামে কয়েকটি প্রকল্পের বিষয়েও তাঁকে অবহিত করা হয়।
স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দ জানিয়েছেন, শুধু ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নন, বিভিন্ন ধর্মের ধর্মতত্ত্ববিদ, পরামর্শদাতা এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদেরও আলোচনায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিল অ্যানথ্রপিক। উদ্দেশ্য ছিল, এআই-এর নৈতিকতা নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা এবং উন্নত এআই ব্যবস্থার আচরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সেগুলির সম্ভাব্য ভূমিকা খতিয়ে দেখা।
স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দের মতে, প্রাচীন দর্শন ও আধুনিক প্রযুক্তির মধ্যে সম্ভাব্য সংযোগ নিয়ে স্নায়ুবিজ্ঞানী, পদার্থবিদ এবং এআই গবেষকদের আগ্রহ ইতিবাচক। তবে প্রযুক্তির নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা যত এগোচ্ছে, ততই প্রশ্ন উঠছে—কেবল যন্ত্রের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করলেই কি সমস্যার সমাধান সম্ভব?
প্রযুক্তি সংস্থার হাতেই কি থাকবে এআই নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা?
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের অ্যালগরিদমিক অ্যাকাউন্টেবিলিটি ল্যাবের নেতৃত্বে থাকা লিখিতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন, এআই নিয়ে বিতর্কে মানুষের অধিকার ও প্রযুক্তি সংস্থাগুলির ক্ষমতার প্রশ্নকে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তাঁর অভিযোগ, বড় মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থাগুলি এআই নিয়ন্ত্রণের নিয়ম তৈরির ক্ষেত্রেও নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে চাইছে। যে সংস্থাগুলি উন্নত এআই তৈরি করছে, তারাই যদি সেই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণের নিয়ম নির্ধারণে প্রাধান্য পায়, তা হলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে।
লিখিতার বক্তব্য, প্রযুক্তি সংস্থাগুলির মতামত আলোচনায় থাকা প্রয়োজন। কিন্তু নিয়ম তৈরির প্রক্রিয়ায় তাদের একচ্ছত্র প্রভাব থাকা উচিত নয়। কারণ, এআই সংস্থাগুলি একদিকে প্রযুক্তির ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করছে, অন্যদিকে বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ এবং বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টাও চালাচ্ছে।
সমালোচকদের মতে, এই দ্বৈত ভূমিকার কারণে এআই নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে স্বাধীন নজরদারি এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু সংস্থাগুলির নিজেদের তৈরি নীতির উপর নির্ভর করলে সাধারণ মানুষের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এআই-এর আগে মানুষের অধিকার কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এআই নৈতিকতা নিয়ে আলোচনার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল মানবাধিকার। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, তা বিচার না করে কেবল যন্ত্র কতটা সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ বা সহানুভূতিশীল হতে পারছে, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকলে সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ অংশ আড়ালে থেকে যেতে পারে।
মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, নজরদারি ব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের উপর ডিজিটাল নজরদারি, অপরাধের ঝুঁকি নির্ধারণে এআই-এর ব্যবহার এবং সামরিক অভিযানে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির প্রয়োগ ইতিমধ্যেই উদ্বেগের কারণ হয়েছে। এই ব্যবস্থাগুলি মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তার উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে কারও উপর বৈষম্য তৈরি হলে, নজরদারির মাধ্যমে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা খর্ব হলে কিংবা এআই-এর সিদ্ধান্তের কারণে কারও জীবন বিপন্ন হলে তার দায় এড়ানো চলবে না। প্রযুক্তির সিদ্ধান্তে মানুষের বাস্তব ক্ষতি হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নকে তাই কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ধর্মীয় দর্শন বনাম মানবাধিকার নয়, প্রয়োজন দুটিই
২৫ মে প্রকাশিত পোপ চতুর্দশ লিওর Magnifica Humanitas শীর্ষক ধর্মীয় পত্রেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন উঠে এসেছে। সেখানে ব্যাপক নজরদারি, প্রযুক্তিগত ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, শ্রমজীবী মানুষের উপর প্রভাব এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের মতো বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি এআই-কে নৈতিকতা শেখানোর প্রশ্নের পাশাপাশি প্রযুক্তি ব্যবহারের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবকেও সামনে নিয়ে আসে। শুধু উন্নত যন্ত্র তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; সেই প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং তার ফলে মানুষের অধিকার সুরক্ষিত থাকছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন মুখ শনাক্তকরণভিত্তিক নজরদারি, সামাজিক স্কোরিং এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকি নির্ধারণে ব্যবহৃত কিছু এআই ব্যবস্থার উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছে। সামরিক ক্ষেত্রে মানুষের উপর প্রাণঘাতী আক্রমণের সিদ্ধান্তে এআই-এর ভূমিকা এবং মানুষের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধেও তারা সরব।
এআই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে মানুষের জীবনকে আরও সহজ করতে পারে, আবার যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে ক্ষমতার অপব্যবহারের হাতিয়ারও হয়ে উঠতে পারে। তাই স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দের মতো ধর্মীয় ও দার্শনিক ব্যক্তিত্বদের মতামত প্রযুক্তি সংস্থাগুলির কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সেই আলোচনার পাশাপাশি প্রয়োজন স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা এবং মানবাধিকারের নিশ্চয়তা।
যন্ত্র কতটা বুদ্ধিমান হবে, তা নিয়ে গবেষণা চলবেই। কিন্তু সেই বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ থাকছে কি না—এআই-এর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সম্ভবত সেই প্রশ্নটিই সবচেয়ে জরুরি।