The NewsNest Desk: গ্রেটার নয়ডায় পিএনবির শাখায় গ্রাহকদের সেভিংস অ্যাকাউন্ট ও ফিক্সড ডিপোজিট থেকে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা উধাও হওয়ার অভিযোগ। সাসপেন্ড ম্যানেজার-সহ পাঁচ কর্মী।
গ্রাহকের অনুমতি নেই, নেই কোনও স্বাক্ষর করা নথি। অথচ সেভিংস অ্যাকাউন্ট ও স্থায়ী আমানত থেকে উধাও কোটি কোটি টাকা! রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক পঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের (পিএনবি) বিরুদ্ধে এমনই গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে উত্তরপ্রদেশের গ্রেটার নয়ডায়। অভিযোগ, একটি শাখায় গ্রাহকদের জমা রাখা প্রায় ৩৫ কোটি টাকার হদিস মিলছে না। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। ইতিমধ্যেই শাখা ম্যানেজার-সহ পাঁচ জন ব্যাঙ্ককর্মীকে সাসপেন্ড করা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন সূত্রে খবর।
সঞ্চয়ের টাকা উধাও, আতঙ্কে গ্রাহকেরা
একাধিক গ্রাহকের অভিযোগ, তাঁদের অনুমতি ছাড়াই অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ এই ধরনের লেনদেনের আগে বা পরে তাঁরা কোনও সতর্কবার্তা কিংবা বিজ্ঞপ্তি পাননি। কারও কারও ক্ষেত্রে কয়েক বছরের সঞ্চয়ের বড় অংশই উধাও হয়ে গিয়েছে বলে অভিযোগ। ব্যাঙ্কের ব্যালেন্স পরীক্ষা করতে গিয়ে কিংবা টাকা তুলতে গিয়ে বিষয়টি প্রথম নজরে আসে।
হানিফ খান নামে এক গ্রাহক সংবাদসংস্থা পিটিআইকে জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট শাখায় তাঁর সেভিংস অ্যাকাউন্টে প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা জমা ছিল। কিন্তু ব্যালেন্স পরীক্ষা করতে গিয়ে তিনি দেখেন, সেই টাকা আর অ্যাকাউন্টে নেই। তাঁর দাবি, টাকা স্থানান্তরের জন্য তিনি কোনও অনুমতি দেননি, এমনকি এ সংক্রান্ত কোনও নথিতে স্বাক্ষরও করেননি।
আর এক গ্রাহক বিজেন্দ্র সিংহের অভিযোগ, তাঁর অ্যাকাউন্টে আগে প্রায় ৮৭ থেকে ৮৮ লক্ষ টাকা ছিল। বর্তমানে সেখানে মাত্র ১ লক্ষ টাকা পড়ে রয়েছে। যদিও তাঁর দাবি অনুযায়ী, ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ তাঁকে ক্ষতিপূরণ দিয়েছে।
বিমানবন্দরের জমির ক্ষতিপূরণের টাকাও গায়েব?
এই ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগগুলির একটি সামনে এসেছে জেওয়ার বিমানবন্দর প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ নিয়ে। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সন্তোষ নামে ৬০ বছর বয়সি এক চা-শিঙারা বিক্রেতার অ্যাকাউন্টে জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ বাবদ ১.২৯ কোটি টাকা জমা পড়েছিল। তাঁর অভিযোগ, সেই টাকা থেকে প্রায় ১.১৮ কোটি টাকা উধাও হয়ে গিয়েছে।
ওই বৃদ্ধের দাবি, এই অর্থই ছিল তাঁর জীবনের শেষ সম্বল। তাঁর ছেলে অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলতে গেলে বিপুল অঙ্কের গরমিল ধরা পড়ে। জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থের ক্ষেত্রেও যদি এমন ঘটনা ঘটে থাকে, তা হলে ব্যাঙ্কের লেনদেনের নিরাপত্তা এবং নজরদারি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে।
বিক্ষোভ, পুলিশি তদন্ত ও পাঁচ কর্মী সাসপেন্ড
বুধবার বহু গ্রাহক নিজেদের অভিযোগের জবাব এবং টাকা ফেরতের দাবিতে ব্যাঙ্কের শাখায় ভিড় করেন। অন্য দিকে, গায়েব হয়ে যাওয়া অর্থ ফেরত এবং ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের দাবিতে শাখার বাইরে বিক্ষোভ দেখান একটি কৃষক ইউনিয়নের সদস্যেরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিএনবির আঞ্চলিক কার্যালয় শাখা ম্যানেজার-সহ পাঁচ জন কর্মীকে সাসপেন্ড করেছে। নয়ডা পুলিশ কমিশনারেটের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত ১৬ জন পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন। তদন্তের তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে গ্রেটার নয়ডার সহকারী পুলিশ কমিশনারকে (এসিপি)। পাশাপাশি, ব্যাঙ্কের দুর্নীতি দমন বিভাগের একটি দলও পৃথকভাবে তদন্ত চালাচ্ছে বলে খবর।
তবে গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট থেকে ঠিক কীভাবে টাকা সরানো হল, কোথায় সেই অর্থ স্থানান্তরিত হয়েছে এবং এই ঘটনায় কারা জড়িত, তা এখনও স্পষ্ট নয়। অভিযোগগুলির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং অর্থের গতিপথ শনাক্ত করাই এখন পুলিশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নীরব মোদী-কাণ্ডের স্মৃতি ফেরাল পিএনবির অভিযোগ
পিএনবির বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। এর আগে হিরে ব্যবসায়ী নীরব মোদী ও মেহুল চোক্সীর বিরুদ্ধে ব্যাঙ্কের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছিল। সেই ঘটনা দেশের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার নজরদারি ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছিল।
এ ছাড়াও উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুরে পিএনবির কারেন্সি চেস্টে বিপুল পরিমাণ জাল নোট উদ্ধারের খবর সামনে এসেছিল। তবে গ্রেটার নয়ডার বর্তমান ঘটনাটি আগের কেলেঙ্কারিগুলির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কি না, তার কোনও তথ্য এখনও সামনে আসেনি।
সব মিলিয়ে, গ্রাহকের অনুমতি ছাড়া সঞ্চয়ের টাকা স্থানান্তরের অভিযোগ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এখন দেখার, তদন্তে প্রকৃত ঘটনা কতটা সামনে আসে, গ্রাহকেরা তাঁদের হারানো অর্থ ফেরত পান কি না এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।