Jogen Chowdhury Dies at 87: The legendary Indian painter leaves behind an enduring legacy in modern art.

Jogen Chowdhury প্রয়াত কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী, থামল তুলির টান, শোকস্তব্ধ শিল্পীমহল

The NewsNest Desk :

তাঁর তুলির আঁচড়ে জীবন্ত হয়ে উঠত মানুষের শরীর, মুখের অভিব্যক্তি, মনের জটিলতা আর সমাজের নানা অসংগতি। রেখার নিজস্ব ভাষায় ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলায় তৈরি করেছিলেন স্বতন্ত্র পরিচিতি। সেই শিল্পী যোগেন চৌধুরী আর নেই। রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ৮৭ বছর বয়সে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে বিরল ধরনের রক্তের ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন বিশিষ্ট এই চিত্রশিল্পী। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় শিল্প ও সংস্কৃতির জগতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

নিজস্ব শিল্পভাষাতেই ছিলেন অনন্য

ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার অন্যতম বিশিষ্ট নাম যোগেন চৌধুরী। তাঁর ছবির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল রেখার ব্যবহার। মানুষের শরীরের গঠন, মুখের অভিব্যক্তি এবং চরিত্রের ভিতরে লুকিয়ে থাকা আবেগকে তিনি ফুটিয়ে তুলতেন এক বিশেষ ভঙ্গিতে। তাঁর ছবিতে বাস্তবের সঙ্গে মিশে থাকত মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতি, সামাজিক টানাপড়েন এবং মানুষের একাকিত্ব।

কালি, জলরং, প্যাস্টেল ও তেলরং-সহ নানা মাধ্যমে কাজ করেছেন তিনি। ভারতীয় ঐতিহ্য ও সমকালীন শিল্পভাবনার মেলবন্ধনে তৈরি হয়েছিল তাঁর নিজস্ব শিল্পভাষা। সেই স্বাতন্ত্র্যই তাঁকে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক শিল্পমহলেও পরিচিতি দিয়েছিল।

ফরিদপুর থেকে শিল্পের জগতে যাত্রা

১৯৩৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরে জন্ম যোগেন চৌধুরীর। দেশভাগের পর তাঁর পরিবার কলকাতায় চলে আসে। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছিল তাঁর। মায়ের আলপনা আঁকার দক্ষতাও তাঁর শিল্পবোধ গঠনে প্রভাব ফেলেছিল।

কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটে পড়াশোনা করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে শিল্পচর্চার সূত্রে প্যারিসে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান। ইউরোপীয় শিল্পভাবনার সঙ্গে পরিচয় তাঁর কাজকে আরও সমৃদ্ধ করে। তবে বিদেশি প্রভাবের অনুকরণে সীমাবদ্ধ না থেকে ভারতীয় অভিজ্ঞতা ও নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিকে মিলিয়ে গড়ে তোলেন স্বতন্ত্র শৈলী।

শিল্পের পাশাপাশি প্রশাসন ও রাজনীতিতেও ভূমিকা

শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও সামলেছেন যোগেন চৌধুরী। রাষ্ট্রপতি ভবনের আর্ট গ্যালারির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীর কলাভবনেও অধ্যাপনার দায়িত্ব পালন করেন। শিল্প ও সংস্কৃতির পরিসরে তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল বহুমুখী।

রাজনীতির ময়দানেও তাঁর উপস্থিতি ছিল। তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ হিসেবে ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত রাজ্যসভায় পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল শিল্পী হিসেবে—যাঁর কাজের নিজস্বতা তাঁকে আলাদা জায়গা দিয়েছিল।

চিরকালীন হয়ে থাকবে তাঁর শিল্পকর্ম

দীর্ঘ শিল্পীজীবনে যোগেন চৌধুরী এমন এক শিল্পভাষা তৈরি করেছিলেন, যা কেবল দৃশ্যের প্রতিরূপ নয়, মানুষের অনুভূতি ও সমাজের অন্তর্লীন বাস্তবতাকেও সামনে আনে। তাঁর ছবির রেখা, অবয়ব ও অভিব্যক্তি দর্শককে বারবার নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

একজন শিল্পীর প্রয়াণে তাঁর শারীরিক উপস্থিতির অবসান ঘটে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির জীবন শেষ হয় না। যোগেন চৌধুরীর ক্ষেত্রেও সেই কথাই প্রযোজ্য। তাঁর রেখে যাওয়া ছবিগুলি আগামী প্রজন্মের শিল্পী ও শিল্পানুরাগীদের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার ইতিহাসে তাঁর অবদান তাই দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।