The NewsNest Desk : দুর্গাপুজোর আনন্দের মাঝেই কলকাতার বুকে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। সপ্তমীর সন্ধ্যায় মধ্য কলকাতার মুক্তারামবাবু স্ট্রিটে চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপে পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনায় অন্তত ১৭ জনের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাসপাতাল সূত্রে এই মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। আহত প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জনকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গিয়েছে।
ঘটনার জেরে পুজোমণ্ডপ চত্বরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কীভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটল, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তবে ঘটনার পরপরই প্রশাসনের তরফে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
আচমকা বৃষ্টি, মণ্ডপে ঢোকার হুড়োহুড়ি
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, সপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপে প্রচুর মানুষের ভিড় জমেছিল। আচমকা বৃষ্টি শুরু হতেই বিপত্তি ঘটে। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে বাইরে থাকা দর্শনার্থীদের একাংশ দ্রুত মণ্ডপের ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে, ভিতরে থাকা মানুষজন বাইরে বেরোতে না পারায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
সরু রাস্তা এবং সীমিত প্রবেশ ও বেরোনোর পথের কারণে ভিড়ের চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে বলে প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে। এর মধ্যেই একটি অস্থায়ী সিঁড়ির কাছে হুড়োহুড়ি শুরু হয়। অনেকে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান। তাঁদের উপর একের পর এক মানুষ পড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নেয়।
প্রাথমিক বিবরণ অনুযায়ী, মাত্র পাঁচ থেকে সাত মিনিটের মধ্যেই এই বিপর্যয় ঘটে থাকতে পারে। যদিও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা রয়েছে।
মণ্ডপের কাঠামো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা
চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপে দুর্গাপ্রতিমার উপরে লোহার কাঠামো ছিল। ওই কাঠামোর কোনও অংশ ভেঙে পড়েছিল কি না, তা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তবে এই সম্ভাবনার সত্যতা এখনও নিশ্চিত নয়।
মণ্ডপে প্রবেশ ও বেরোনোর রাস্তা তুলনামূলকভাবে সরু হওয়ায় বিপদের সময় মানুষজনের চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয় বলে অভিযোগ। এক দর্শনার্থীর দাবি, সংলগ্ন পার্বতী ঘোষ লেন বন্ধ থাকায় উদ্ধারকাজে সমস্যা হয়েছিল। তাঁর আরও অভিযোগ, ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুল্যান্স ঢুকতে পারেনি এবং পুলিশকর্মীদেরও সেই সময় দেখা যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেরাই উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেন বলে তিনি দাবি করেছেন।
অন্য এক দর্শনার্থী জানান, তাঁর সঙ্গে মণ্ডপ দেখতে আসা তিন বন্ধু ভিড়ের চাপে মাটিতে পড়ে যান। তাঁদের টেনে তোলার চেষ্টা করেও প্রথমে সফল হননি তিনি। পরে আরও কয়েকজনের সাহায্যে তাঁদের উদ্ধার করার চেষ্টা করা হয়।
ঘটনাস্থলে মুখ্যমন্ত্রী, হাসপাতালে আহতদের দেখতে
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘটনাস্থলে যান। পরে তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালেও আহতদের দেখতে যান। রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সারদ্বত মুখোপাধ্যায়ও হাসপাতালে পৌঁছন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে খবর, মৃত ও আহতদের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন জেলার বাসিন্দা হতে পারেন বলে অনুমান করা হচ্ছে। ঘটনার পর চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
চলতি বছর ৯১ বছরে পা দিয়েছে এই পুজো। ঘটনার পাঁচ দিন আগে মুখ্যমন্ত্রী মণ্ডপটির উদ্বোধন করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কলকাতায় আগেও পুজোয় ভিড়ের বিপত্তি
কলকাতার দুর্গাপুজোয় অতিরিক্ত ভিড় সামলানো নিয়ে আগেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ২০২১ সালে শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাবের দুর্গাপুজোয় পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে তিনজন গুরুতর আহত হওয়ার পর পুজো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ২০১৫ সালে দক্ষিণ কলকাতার দেশপ্রিয় পার্কের পুজোতেও একই ধরনের পরিস্থিতিতে প্রায় ১১ জন আহত হন। সেই ঘটনার পরও পুজো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
চোরবাগানের দুর্ঘটনা ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
শোকপ্রকাশ মমতা ও অভিষেকের
এই দুর্ঘটনায় শোকপ্রকাশ করেছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন তিনি। তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি, ঘটনার যথাযথ তদন্ত এবং দায় নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তিনি। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করে অভিষেক বলেন, মানুষের জীবনের চেয়ে বড় কোনও অগ্রাধিকার হতে পারে না।
দুর্গাপুজোর আনন্দের সন্ধ্যায় এই মর্মান্তিক ঘটনা জননিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নকে ফের সামনে এনে দিল। তবে ঠিক কী কারণে এই বিপর্যয় ঘটল এবং হতাহতের চূড়ান্ত সংখ্যা কত, তা জানতে সরকারি বিবৃতি ও তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা রয়েছে।