The NewsNest Desk : ইয়ামি গৌতমের অভিনয়েও বাঁচল না বালাজি মোহনের ছবি! পিতৃতন্ত্র ও নারীস্বাধীনতার আকর্ষণীয় ভাবনা নিয়ে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত পৌরাণিক নাটকীয়তা, অতিরিক্ত চিৎকার আর দুর্বল চিত্রনাট্যে দিশাহারা ‘নয়ি নভেলি’।
হরর-কমেডির মোড়কে পিতৃতন্ত্র, নারীস্বাধীনতা এবং সমাজের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল ‘নয়ি নভেলি’ ছবিতে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারল না পরিচালক বালাজি মোহন। ইয়ামি গৌতম অভিনীত এই ছবি প্রথমে পারিবারিক রহস্য ও অতিপ্রাকৃত ঘটনার মিশেলে দর্শককে আকর্ষণ করলেও, ক্রমশ গল্পের খেই হারিয়ে ফেলে। একসময় যে ছবির কেন্দ্রে ছিল এক রহস্যময় নারী, শেষ পর্যন্ত সেটিই পরিণত হয় পৌরাণিক অস্ত্র, দানবীয় অবয়ব আর অতিরিক্ত নাটকীয়তার প্রদর্শনীতে।
মিরাটের পটভূমিতে তৈরি এই ছবির গল্পে রয়েছে এক অদ্ভুত পরিবার, সন্দেহপ্রবণ এক তরুণ এবং এক রহস্যময় মহিলা, যাঁর উপস্থিতি পরিবারের পুরুষদের অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। শুরুতে মনে হয়, প্রচলিত সামাজিক নিয়ম ভেঙে নিজের মতো করে বাঁচতে চাওয়া এক নারীর গল্প দেখতে চলেছেন দর্শক। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে ধরে রাখতে পারেননি পরিচালক।
ছবির কেন্দ্রে রাজা অবস্থি (আদিনাথ কোঠারে) এবং তাঁর স্ত্রী মোহিনী (ইয়ামি গৌতম ধর)। সুন্দরী, বুদ্ধিমতী, শান্ত এবং পরিস্থিতি সামলাতে দক্ষ মোহিনী যেন নিখুঁত একজন মানুষ। পরিবারের মহিলারা তাঁকে পছন্দ করেন। কারণ, মোহিনীর সাহায্যে তাঁরা নিজেদের জীবনের উপর আরও বেশি অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। অন্যদিকে, পরিবারের পুরুষদের মনে প্রশ্ন—রাজা কীভাবে এমন একজন অসাধারণ মহিলাকে স্ত্রী হিসেবে পেলেন?
রাজের ছোট ভাই বান্টু (অনুরাগ ঠাকুর) অবশ্য মোহিনীকে মোটেই বিশ্বাস করে না। তার ধারণা, মোহিনী আসলে এক ডাইনি। পরিবারের অন্যদেরও নিজের সন্দেহের কথা বোঝাতে মরিয়া হয়ে ওঠে সে। রহস্যজনক ঘটনা, অতীতের কিছু দৃশ্য এবং মোহিনীর সঙ্গে পরিচিত পুরুষদের আহত হওয়া কিংবা মৃত্যুর ঘটনাকে নিজের দাবির পক্ষে প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে বান্টু।
ছবির প্রথমার্ধে বান্টুর এই সন্দেহকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয় নানা হাস্যকর পরিস্থিতি। বাড়ির ছাদ যেন এক অদ্ভুত আদালত, যেখানে প্রত্যেকের নিজস্ব মতামত রয়েছে, কিন্তু কেউই বেশিক্ষণ অন্যের কথা শুনতে রাজি নয়। পরিবারের খুনসুটি, বিচিত্র স্বভাবের সদস্যদের কথাবার্তা এবং মোহিনীকে ঘিরে রহস্যের আবহ ছবির কিছু মুহূর্তকে উপভোগ্য করে তোলে।
বিশেষ করে অনুরাগ ঠাকুরের কমিক টাইমিং বেশ কয়েকটি দৃশ্যে প্রাণ সঞ্চার করেছে। পরিবারের মহিলারা যখন বান্টুর অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে মোহিনীর পাশে দাঁড়ান, তখন ছবির নারীস্বাধীনতার ভাবনাটিও কিছুটা স্পষ্ট হয়। মোহিনীর আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনচেতা মনোভাব যে পুরুষদের অস্বস্তির কারণ, সেই ইঙ্গিতও রয়েছে গল্পে।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন মোহিনীর আসল পরিচয় প্রকাশ পেতে থাকে। তখনই রামায়ণের প্রসঙ্গ ক্রমশ ছবির কেন্দ্রে চলে আসে। রাম, রাবণ এবং হনুমানকে ঘিরে পৌরাণিক ব্যাখ্যা গল্পের উপর এমনভাবে চেপে বসে যে, প্রথমার্ধের পারিবারিক রহস্য কার্যত হারিয়ে যায়। চরিত্রগুলির আবেগ ও সম্পর্কের বিকাশের বদলে ছবির বড় অংশ জুড়ে চলে ঘটনার ব্যাখ্যা আর নীতিকথা।
ভারতীয় পুরাণকে গল্পে ব্যবহার করাই যে সমস্যার কারণ, তা নয়। সমস্যা হল, সেই উপাদানকে চিত্রনাট্যে যথাযথভাবে মেলাতে পারেননি নির্মাতারা। মোহিনী প্রথমে ছিলেন এক আকর্ষণীয় রহস্যময় চরিত্র। কিন্তু পরবর্তী অংশে তিনি যেন নিজের ব্যক্তিত্ব হারিয়ে ছবির বক্তব্য বোঝানোর মাধ্যম হয়ে ওঠেন। পিতৃতন্ত্র ও নারীস্বাধীনতা নিয়ে যে প্রশ্নগুলি প্রথমে গল্পকে আকর্ষণীয় করে তুলেছিল, সেগুলিও ধীরে ধীরে প্রচলিত শুভ-অশুভের লড়াইয়ের আড়ালে চাপা পড়ে যায়।
প্রযুক্তিগত দিক থেকেও ছবিটি খুব একটা স্বস্তি দেয় না। মোহিনীর উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য, অতিরঞ্জিত অ্যাকশন এবং হঠাৎ দানবীয় রূপ ধারণ করা চরিত্রগুলি ভয়ের চেয়ে বিভ্রান্তিই বেশি তৈরি করে। জম্বির মতো দেখতে কিছু প্রাণীর উপস্থিতিও ছবির হরর উপাদানকে শক্তিশালী করার বদলে গল্পের বিশৃঙ্খলা বাড়িয়েছে।
ক্লাইম্যাক্সে গিয়ে সেই বাড়াবাড়ি চরমে পৌঁছয়। শিবের ত্রিশূল, হনুমানের গদা এবং রামের ধনুক—একের পর এক পৌরাণিক প্রতীক হাজির হয় পর্দায়। দৃশ্যের জাঁকজমক বাড়লেও চরিত্রগুলির সঙ্গে দর্শকের আবেগের সংযোগ তৈরি হয় না। ফলে শেষ পর্যন্ত এই লড়াই যতটা বড় করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে, ততটা প্রভাব ফেলতে পারেনি।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে ইয়ামি গৌতম শুরুতে নজর কাড়েন। তাঁর পর্দায় উপস্থিতি এবং সংযত অভিনয় মোহিনী চরিত্রটিকে রহস্যময় করে তুলেছিল। কিন্তু গল্প যত এগিয়েছে, চরিত্রটির স্বাভাবিক আকর্ষণ ততই কমেছে। আদিনাথ কোঠারে রাজা হিসেবে মোটামুটি ভালো, বিশেষ করে নিজের সৌভাগ্য নিয়ে আত্মবিশ্বাসী থাকা থেকে ধীরে ধীরে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ার মুহূর্তগুলিতে। মিতা বশিষ্ঠ-সহ পার্শ্বচরিত্রের অভিনেতারাও কিছু দৃশ্যে নজর কাড়লেও দুর্বল চিত্রনাট্য তাঁদের খুব বেশি সুযোগ দেয়নি।
জি ভি প্রকাশ কুমারের আবহসংগীতও ছবির দুর্বলতা ঢাকতে পারেনি। অতিরিক্ত জোরালো সুর বারবার দৃশ্যের উপর চেপে বসেছে। ফলে উত্তেজনা তৈরির বদলে তা ক্লান্তিকর হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে, ‘নয়ি নভেল্লি’ এমন একটি ছবি, যার মূল ভাবনায় আকর্ষণ ছিল, কিন্তু চিত্রনাট্য সেই ভাবনাকে ধরে রাখতে পারেনি। হরর, কমেডি, নারীবাদ এবং পুরাণের মিশেলে নতুন কিছু করার চেষ্টা থাকলেও উপাদানগুলির মধ্যে সামঞ্জস্যের অভাব প্রকট। ইয়ামি গৌতমের অভিনয় এবং প্রথমার্ধের কয়েকটি মজার মুহূর্ত বাদ দিলে ছবিটি শেষ পর্যন্ত হতাশই করে।