English Subhead: Bardhaman Das Bari Durga Puja: 150-Year-Old Tradition of Goddess Hargauri

Bardhaman বর্ধমানের দাসবাড়িতে দুর্গা নন, হরগৌরী রূপে পূজিতা দেবী! ১৫০ বছরের ঐতিহ্যে জড়িয়ে শঙ্খচিলের কাহিনি

The News Nest Desk : সময় বদলেছে। বদলেছে জীবনযাত্রা, হারিয়ে গিয়েছে জমিদারি প্রথা। একসময়ের প্রতিপত্তি আর জৌলুসও আজ অতীতের স্মৃতি। কিন্তু এত কিছুর পরেও বর্ধমানের এক বনেদি বাড়িতে আজও অটুট রয়েছে দেড়শো বছরেরও বেশি পুরনো দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য। শহরের খাজা আনোয়ার বেড় এলাকার দাসবাড়িতে দেবী দুর্গা পূজিতা হন এক ব্যতিক্রমী রূপে—হরগৌরী হিসেবে। আর এই পুজোকে ঘিরেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে রয়েছে শঙ্খচিলের এক কাহিনি।

মহিষাসুরমর্দিনী নন, এখানে দেবী হরগৌরী

বাংলার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো মানেই নানা প্রাচীন রীতি, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অজস্র স্মৃতি। বর্ধমানের দাসবাড়ির পুজোও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে এই পুজোর বিশেষত্ব দেবীর রূপে।

এখানে দেবীকে প্রচলিত মহিষাসুরমর্দিনী রূপে দেখা যায় না। বরং পার্বতী ও মহাদেবের যুগল উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে হরগৌরী রূপে তাঁর আরাধনা করা হয়। একচালার প্রতিমায় দেবী পার্বতীর পাশে থাকেন মহাদেব। তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ।

স্থানীয় ঐতিহ্য ও পারিবারিক বিশ্বাসের সঙ্গে মিশে থাকা এই প্রতিমার বিন্যাসই দাসবাড়ির পুজোকে অন্য অনেক বনেদি বাড়ির পুজোর থেকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।

জমিদার মাখনলাল দাসের হাত ধরে পুজোর সূচনা

প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, দাসবাড়ির দুর্গাপুজোর সূচনা করেছিলেন জমিদার মাখনলাল দাস। প্রথম দিকে মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে নয়, ঘট স্থাপন করেই দেবীর আরাধনা করা হতো। পরবর্তী সময়ে তাঁর পুত্র ব্রজেন্দ্রলাল দাসের আমলে পুজোর রীতিতে পরিবর্তন আসে।

পরিবারকে ঘিরে প্রচলিত একটি কাহিনি অনুসারে, ব্রজেন্দ্রলাল দাস স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর দেবীকে হরগৌরী রূপে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর সন্তান লাভের কাহিনিও এই পুজোর লোকবিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। সেই বিশ্বাস থেকেই দাস পরিবারের কাছে পুজোটি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, পারিবারিক ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

অবশ্য স্বপ্নাদেশের এই কাহিনি পরিবারের মধ্যে প্রচলিত বিশ্বাস হিসেবেই পরিচিত। ইতিহাসের নথিভুক্ত তথ্য এবং লোককথার মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।

শঙ্খচিলকে ঘিরে বিশেষ লোকবিশ্বাস

দাসবাড়ির দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শঙ্খচিলের কাহিনি। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, মহাষ্টমীর সন্ধিপুজো এবং বিজয়া দশমীর বিসর্জনের সময় মন্দিরের আকাশে শঙ্খচিলের উড়ান তাঁদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই বিশ্বাস পুজোর ঐতিহ্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তবে শঙ্খচিলের উপস্থিতিকে ঘিরে যে আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা প্রচলিত রয়েছে, তা পরিবারের বিশ্বাস ও লোককথার অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।

লোকবিশ্বাসের এমন নানা উপাদান বাংলার পুরনো পারিবারিক পুজোগুলির ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। দাসবাড়ির ক্ষেত্রেও সেই ধারার ব্যতিক্রম নেই।

গাওয়া ঘিয়ের লুচি থেকে মণ্ডা—ভোগেও রয়েছে নিজস্বতা

পুজোর রীতিনীতি এবং ভোগের আয়োজনেও দাসবাড়ি ধরে রেখেছে পুরনো প্রথা। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেবীকে গাওয়া ঘিয়ে ভাজা লুচি, কাঁঠালি কলা এবং নারকেলের মিষ্টি নিবেদন করা হয়।

একসময় সন্ধিপুজোয় পশুবলির প্রথা ছিল বলে জানা যায়। পরে সেই রীতি বন্ধ করে তার পরিবর্তে মণ্ডা নিবেদনের প্রচলন হয়। দীর্ঘ সময় ধরে আচার-অনুষ্ঠানের এই পরিবর্তন দেখায়, কীভাবে একটি পারিবারিক পুজো তার মূল ঐতিহ্য বজায় রেখেও সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলেছে।

রাজপরিবারের আনাগোনা, যাত্রাপালার স্মৃতি

জমিদারি আমলে দাসবাড়ির পুজোকে কেন্দ্র করে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনও হতো। পরিবারের ইতিহাস নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলিতে উল্লেখ রয়েছে, একসময় বাড়ির দুর্গাদালানে যাত্রাপালা ও গানের আসর বসত। বর্ধমানের রাজপরিবারের সদস্যদেরও এই পুজোয় আসার কথা জানা যায়।

আজ সেই অতীতের জৌলুস অনেকটাই ম্লান। জমিদারি নেই, আগের মতো সামাজিক প্রতিপত্তিও নেই। তবু পুজোর দিনগুলিতে পরিবারের সদস্যদের একত্র হওয়া এবং পুরনো রীতিনীতি মেনে দেবীর আরাধনা করার মধ্য দিয়ে ঐতিহ্যটি টিকে রয়েছে।

ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখাই এখন বড় কথা

বর্ধমানের খাজা আনোয়ার বেড়ের দাসবাড়ির দুর্গাপুজোকে শুধু একটি প্রাচীন ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে দেখলে তার সম্পূর্ণ পরিচয় ধরা পড়ে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি পরিবারের ইতিহাস, জমিদারি যুগের স্মৃতি, প্রতিমার বিশেষত্ব, পুরনো সামাজিক আয়োজন এবং প্রজন্মান্তরে বয়ে চলা লোকবিশ্বাস।

সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই হারিয়ে যায়। পুরনো বাড়ির দেওয়াল জীর্ণ হয়, বদলে যায় মানুষের জীবনযাত্রা, ম্লান হয়ে আসে একসময়ের আড়ম্বর। কিন্তু কোনও কোনও ঐতিহ্য টিকে থাকে মানুষের বিশ্বাস ও আন্তরিকতার জোরে।

দাসবাড়ির পুজোও তেমনই এক উত্তরাধিকার। এখানে দেবী হরগৌরীর আরাধনা আর শঙ্খচিলকে ঘিরে প্রচলিত কাহিনি মিলেমিশে তৈরি করেছে বর্ধমানের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি বিশেষ অধ্যায়।